বোরহান উদ্দিন
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম
# প্রতিষ্ঠাতা ও রূপকার জিয়াউর রহমান
# আপসহীন ও পরীক্ষিত নেতৃত্ব খালেদা জিয়া
# রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন যুগে তারেক রহমান
রাজনীতির উত্থান-পতন, রক্তাক্ত পটপরিবর্তন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম আর ক্ষমতার পালাবদলের নানা অধ্যায় পেরিয়ে ৪৯ বছরে পা দিয়েছে বিএনপি। সময়ের পরিক্রমায় ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা দলটির নেতৃত্বে এসেছেন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। তিন ভিন্ন সময়ে, তিন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠা, গণভিত্তি তৈরি এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপির ইতিহাসও যেন তিন নেতৃত্বের তিন আলাদা অধ্যায়ে বিভক্ত।
জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণভিত্তি সুদৃঢ় করা এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ফের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-এই পথচলায় বিএনপির অর্জন যেমন আছে, তেমনি আছে বিতর্ক, সংকট ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও।
প্রতিষ্ঠার ৪৯ বছরে এসে তাই বিএনপির ইতিহাস শুধু ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার হিসাব নয়, এটি তিন নেতৃত্বের রাজনৈতিক কৌশল, সাফল্য-ব্যর্থতা এবং বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের অভিযোজনেরও গল্প।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান-তিন নেতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্বের কৌশল ছিল ভিন্ন। রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাদের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার ধরন ছিল আলাদা।
সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে অবশ্য শুরুতেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারের ছয় মাসের মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছে সরকার। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে।
জিয়াউর রহমান: পরিচয় তৈরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা
১৯৭৫-এর রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সামরিক শাসনের মধ্যেই তিনি বহুদলীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেন। ডান থেকে বাম-বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক শক্তিকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে ১৯৭৮ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির

জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে চিহ্নিত হয় ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন, যা ভূখণ্ডের সীমানা ও সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করে নতুন এক রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত গড়ে তোলে। অর্থনীতিতেও তিনি রাষ্ট্রনির্ভর কাঠামোর বাইরে গিয়ে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করার সাহসী পদক্ষেপ নেন।
তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি, কৃষি উন্নয়ন, জনশক্তি রফতানি, পরিবার পরিকল্পনা ও খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছিল।
আরও পড়ুন: হুইল চেয়ারে দেশ ছেড়ে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও লেজেসমির প্রশ্নটি জিয়ার শাসনামলে বিতর্কের জায়গাও তৈরি করেছিল। সামরিক আইন বহাল রেখে রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি দলটির জন্মলগ্নের এক ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসেবে আজও আলোচনায় থাকে।
খালেদা জিয়া: আন্দোলন ও গণভিত্তির নির্বাচনী সত্তা
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল বিএনপি। সেই চরম দুর্দিনে দলের হাল ধরেন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপিকে কেবল সেনা কাঠামোর ভেতর থেকে বের করে আনেননি, বরং দলটিকে দেশের অন্যতম প্রধান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেন।
আশির দশকে এরশাদবিরোধী নয় বছরের আপসহীন নেতৃত্ব তাকে জাতীয় রাজনীতির সম্মুখসারিতে অনন্য মর্যাদায় আসীন করে।
প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন। তার প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬) সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি এবং ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন তার সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে সমাদৃত।
তবে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচন দলটির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। পরবর্তীতে তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান এনে ক্ষমতা ছাড়েন তিনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের আধুনিকায়ন ও জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য পেলেও দুর্নীতি, জোটসঙ্গীদের অতিরিক্ত প্রভাব এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা দলকে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক সংকটে ফেলেছিল। সেই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পথ প্রশস্ত করেছিল।
তারেক রহমান: পুনর্গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার আধুনিক পরীক্ষা
২০০৮ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিএনপির জন্য শুরু হয় দীর্ঘ এক প্রতিকূল সময়। একের পর এক মামলা, গ্রেপ্তার এবং শীর্ষ নেতৃত্বের অসুস্থতার মধ্যেও লন্ডনে বসে দলীয় কার্যক্রম ধরে রাখেন তারেক রহমান। দেড় দশকেরও বেশি সময় প্রবাসে থাকার পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারায় ২০২৫ সালের শেষভাগে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর দ্রুত দলকে সংগঠিত করে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপিকে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরানোর ক্ষেত্রে তার সাংগঠনিক দক্ষতারই প্রতিফলন ঘটেছে।
তবে ভোটের মাঠের বৈতরণী পার হওয়ার পর এবার শুরু হয়েছে তারেক রহমানের প্রকৃত রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা। সরকার গঠনের পর প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পুরনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের গড়া ভিত্তিকে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক পরিপক্কতা দিয়ে গণভিত্তিক করে তুলেছিলেন। আর তারেক রহমান চরম প্রতিকূলতার মাঝেও প্রবাস থেকে দলকে সুসংগঠিত রেখে আজকের আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার ধাপে নিয়ে এসেছেন। তিন মেয়াদের এই সংগ্রাম ও ত্যাগের ধারাবাহিকতাই মূলত বিএনপির রাজনৈতিক চালিকাশক্তি।’
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বার্তা ও কর্মসূচি
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার পর জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই জনগণের মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্র সুরক্ষার পবিত্র দায়িত্ব নিয়ে বিএনপির জন্ম হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন দলটি
১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশজুড়ে দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৯টায় শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ।
সামাজিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে মৎস্য অবমুক্তকরণ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেবেন যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তদারকি করবেন পানিসম্পদমন্ত্রী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
এছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিইউ/এমআর