নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে গভীর রাতে মোটরসাইকেলে দুই তরুণের মাঝে এক তরুণীকে অনেকটা নিথর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা ও নানা জল্পনা তৈরি হয়। কেউ কেউ তাকে মৃত বা গুরুতর অসুস্থ বলেও ধারণা করেন। তবে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে ওই তরুণী নিজেই জানিয়েছেন, তিনি মদ পান করেছিলেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়ায় মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তিরা তাকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরের পর টঙ্গী পশ্চিম থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই তরুণী এসব কথা বলেন।
মদপান করেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি নিজেই মদ খেয়েছি। কেউ তো খাওয়ায় দেয় নাই। ওই লোকগুলো (বাইকের) আসছে আমাকে সাহায্য করতে।’
পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আপাতত তরুণীকে তার বোনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ (উত্তর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে ওই তরুণী জানিয়েছেন, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি নিজ বাড়িতে গিয়ে মদ পান করেন।
পরে মদ্যপ অবস্থায় তিনি ওই দুই তরুণের সঙ্গে যান বলে জানান ডিসি। তিনি বলেন, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তিকে পুলিশ খুঁজছে। তারা হয়তো ভয়ে সামনে আসছেন না। তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ডিসি শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্তের স্বার্থে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
পুলিশ ও সাংবাদিকদের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ওই তরুণী জানান, পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। একপর্যায়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান এবং পরে একটি বারে গিয়ে মদ পান করেন।
তার ভাষ্য, ‘ফ্যামিলিতে যে দণ্ডগুলো হয়, এগুলো আমি নিতে পারিনি। এই মেন্টাল টর্চারের কারণে আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছিলাম, হয়তো আজকে আমি মারা যাব, নয়তো একটা কিছু করব। জিদে আমি বারে চলে গিয়েছিলাম।’
তিনি জানান, বারে যাওয়ার পর অতিরিক্ত মদ পান করায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ফোন করে তাকে এক বান্ধবীর বাসায় পৌঁছে দিতে বলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই তরুণী বলেন, মোটরসাইকেলে ওঠার সময় পর্যন্ত তার কিছুটা জ্ঞান ছিল। এরপর মাঝপথে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
তার ভাষ্য, ‘আমি যখন গাড়িতে উঠি, আমাকে যে গাড়িতে উঠানো হচ্ছে—এ পর্যন্ত আমার সেন্স ছিল। তারপর আমার সেন্স ছিল না।’
ওই তরুণী দাবি করেন, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তির একজন তার পরিচিত এবং তাকে তিনি ‘কাকা’ বলে ডাকেন। গান গাওয়ার সূত্রে ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, অসুস্থ হওয়ার পর তিনি ওই ব্যক্তিকে ফোন করেছিলেন। পরে তিনি এসে তাকে নিয়ে যান। মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা অপর ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন বলেও জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তরুণীর একাধিক বিয়ে, ব্যক্তিগত জীবনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এসব তথ্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন তিনি। তরুণীর দাবি, তার সাবেক স্বামী শাহরিয়ার তাকে বিপদে ফেলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়াচ্ছেন।
তরুণী বলেন, ‘আমি এখন একটা ট্রাপে পড়ে গেছি। আমার যে সেকেন্ড হাসবেন্ড (সাবেক স্বামী), উনি এই জিনিসগুলো ছড়াচ্ছেন, এগুলো সত্য না।’
একাধিক বিয়ের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ৫-৬টা বিয়ে হয়নি। এরকম যদি হয়, তাহলে এগুলো এমনিতেই সামনে চলে আসবে।’
ঘটনাটি সামনে আসে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ভোরে। মাদরাসাতুল মাদীনা-বগুড়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি মনোয়ার হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, উমরাহর সফর শেষে বগুড়া ফেরার পথে গাড়ি থেকে দৃশ্যটি দেখতে পান।

ছবিতে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে দুই তরুণের মাঝে এক তরুণী বসে আছেন। তার পা নিচের দিকে ঝুলছিল এবং তাকে অনেকটা নিস্তেজ দেখাচ্ছিল। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়।
অনেকে ধারণা করেন, তরুণীটি হয়তো মারা গেছেন কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধের শিকার হয়েছেন। বিষয়টি পুলিশের নজরেও আসে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন জানান, ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি থানার এলাকা অতিক্রম করে গাজীপুরের গাছা থানার দিকে চলে যায়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, মোটরসাইকেলটির নম্বর শনাক্ত করা হয়েছে। ওই নম্বরের সূত্র ধরে মোটরসাইকেলটির মালিক ও আরোহীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তরুণীর দেওয়া বক্তব্যে ভাইরাল ভিডিওকে ঘিরে তৈরি হওয়া রহস্যের একটি অংশের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও ঘটনার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট হয়নি। বিশেষ করে ওই রাতে তরুণী কোথা থেকে বের হয়েছিলেন, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি ঠিক কখন ও কোথা থেকে তাকে নিয়ে যান, তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল এবং ভিডিওটি ধারণের সময় তার প্রকৃত শারীরিক অবস্থা কী ছিল—এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন।
পুলিশ জানিয়েছে, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
এদিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তরুণীকে তার বোনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি যাচাই এবং ঘটনার সঙ্গে কোনো অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
জেবি