নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৩ এএম
বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
১৯২১ সালের ডিসেম্বর। বড়দিনের রাত। কলকাতার ৩/৪সি, তালতলা লেনের একটি বাড়িতে বসে কাঠপেনসিলে কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ লেখা শুরু করেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধফেরত ২২ বছরের তরুণ কাজী নজরুল ইসলাম।
সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে বাংলা কবিতায় নতুন ধারার সূচনা করেছিল এই কবিতা। এক শতাব্দী পেরিয়েও ‘বিদ্রোহী’র আবেদন এতটুকু কমেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল বলেন, ঔপনিবেশিক ভারতের সেই সময়ে নজরুল স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চেতনা তুলে ধরছিলেন। ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’—এর মাধ্যমে তিনি বাঙালিকে বীরের মতো উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভীরু বাঙালিকে জাগিয়ে তুলতে শব্দের ঝংকারে কবিতাটি যেন ছুটে চলেছে।
যেভাবে লেখা হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’
কলকাতার ওই বাড়িতে নজরুলের সঙ্গে থাকতেন কমরেড মুজফফর আহমদ। তার ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কবিতাটি লেখা হয়।
মুজফফর আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়িটির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি ঘরে থাকতেন তারা। রাতের কোনো এক সময়ে নজরুল সেখানে কবিতাটি লেখেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুজফফর আহমদকে কবিতাটি পড়ে শোনান তিনি।
মুজফফর আহমদ লিখেছেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার তিনিই প্রথম শ্রোতা। তবে সামনাসামনি প্রশংসা করতে না পারায় কবিতা শুনেও তিনি খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। এতে নজরুল মনে মনে আহত হয়েছিলেন বলে তার ধারণা।
কবিতাটি পেন্সিলে লেখার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন মুজফফর আহমদ। তার ভাষ্য, তখন তাদের ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারবার কলম ডুবিয়ে লেখার গতি বজায় রাখা কঠিন হতো। তাই নজরুল সম্ভবত পেন্সিলে কবিতাটি লিখেছিলেন।
সেদিন বেলা বাড়ার পর ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার আফজালুল হক ওই বাড়িতে আসেন। নজরুল তাকেও কবিতাটি পড়ে শোনান। তিনি কবিতাটির একটি কপি সঙ্গে নিয়ে যান।
এরপর অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য নামে একজনও কবিতাটি শুনে দ্রুত প্রকাশের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শে নজরুল পেন্সিলে লেখা মূল কবিতা থেকেই একটি কপি করে দেন, যাতে সেটি ‘বিজলী’ পত্রিকায় আগে প্রকাশ করা যায়।
‘বিজলী’তে প্রকাশ, ব্যাপক সাড়া
১৩৯ পঙ্ক্তির ‘বিদ্রোহী’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি, শুক্রবার, সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায়। কবিতাটি প্রকাশের পর পাঠকের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। চাহিদা এত বেশি ছিল যে ওই সপ্তাহে পত্রিকাটি দুইবার মুদ্রণ করতে হয়।
পরে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকার কার্তিক সংখ্যাতেও কবিতাটি প্রকাশিত হয়। তবে মুজফফর আহমদের ধারণা, ওই সংখ্যা ফাল্গুন মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।
‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাতের কথাও উল্লেখ করেছেন মুজফফর আহমদ। অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বর্ণনা অনুযায়ী, নজরুল কবিতাটি পড়ে শোনালে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
‘ভাব চুরি’র অভিযোগ
‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের পর কবি মোহিতলাল মজুমদার অভিযোগ করেন, তার ‘আমি’ শীর্ষক লেখার ভাব নিয়ে নজরুল কবিতাটি লিখেছেন। তবে মুজফফর আহমদ এই অভিযোগ মানেননি।
মুজফফর আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, এর প্রায় এক বছর আগে একটি সাহিত্য আসরে ‘মানসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত নিজের ‘আমি’ গদ্যটি পড়ে শুনিয়েছিলেন মোহিতলাল। সেখানে নজরুল ও মুজফফর আহমদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
তবে একবার শুনে এত দীর্ঘ কবিতা সেই লেখার ভাব নিয়ে রচনা করা হয়েছে—এটি তিনি বিশ্বাস করেননি। তাঁর ধারণা, মোহিতলালের লেখা শুনে নজরুলের মনে হয়তো এ ধরনের একটি কবিতা লেখার ভাবনা আসতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ গুপ্তও ‘বিংশ শতাব্দী’তে মোহিতলালের ‘আমি’ প্রবন্ধের সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’র ভাবগত সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি লিখেছেন, নজরুলের কবিতাটি যে তাঁর নিজস্ব আত্মগত প্রেরণার ফল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
‘বিদ্রোহী’ নিয়ে ব্যঙ্গও কম হয়নি। সজনীকান্ত দাস ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় ‘ব্যাঙ’ নামে একটি প্যারোডি কবিতা প্রকাশ করেন। সেখানে ‘আমি ব্যাঙ, লম্বা আমার ঠ্যাং’—এর মতো পঙ্ক্তি লিখে ‘বিদ্রোহী’র ভাষা ও ভঙ্গিকে ব্যঙ্গ করা হয়।
সময়ের পালাবদলের প্রভাব
‘বিদ্রোহী’ লেখার সময় বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন চলছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব, ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন এবং তুরস্কে কামাল পাশার উত্থান—সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছিল মানুষের চিন্তা ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা।
নজরুল গবেষক ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলা কবিতায় তখন রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা লেখার একটি রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার ও যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সেই বলয়ের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি বের হতে পারেননি। প্রমথ চৌধুরী অবশ্য চলিত ভাষার প্রচলন করেছিলেন।
রফিকুল ইসলামের মতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বলশেভিক বিপ্লব, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ও তুরস্কে কামাল পাশার আবির্ভাব নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’র মতো কবিতা লেখার জন্য প্রভাবিত করেছিল।
বুদ্ধদেব বসুর একটি মন্তব্যও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। তার মতে, বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রপ্রভাব এতটাই সর্বগ্রাসী ছিল যে এর বাইরে যাওয়ার পথ যেন ছিল না। ‘বিদ্রোহী’র পতাকা উড়িয়ে নজরুলের আবির্ভাব সেই পরিস্থিতি বদলে দেয়।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ভাষায়, ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিক বাংলা কবিতার সূচনা হয়। বাংলা সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনেও কবিতাটি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
ব্রিটিশ আমলেও নজরে ছিল ‘বিদ্রোহী’
কবিতাটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মধ্যেও এটি নিষিদ্ধ করা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলেও যেসব পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয়েছিল, সেগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে জব্দ করা হতো বলে জানান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
তার মতে, আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও কার্যত একধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’র মতো এত ব্যাপক আলোড়ন আর কোনো কবিতা সৃষ্টি করেছে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বাকরুদ্ধ কবিও ‘বিদ্রোহী’ শুনে উদ্বেলিত হতেন
১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারান কাজী নজরুল ইসলাম। এরপর তিনি আর কবিতা বা গান লিখতে পারেননি। তবে প্রিয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’ শুনলে তার প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর।
নজরুলের নাতনি খিলখিল কাজী বলেন, তার বাবা কাজী সব্যসাচী নজরুলের সামনে প্রায়ই ‘বিদ্রোহী’ আবৃত্তি করতেন।
তিনি বলেন, কবিতাটি শুনলেই নজরুলকে ভীষণভাবে উদ্বেলিত হতে দেখা যেত। তার চোখেমুখে এমন অনুভূতি ফুটে উঠত, যেন পৃথিবীতে তখনো অন্যায়-অবিচার চলছে এবং কথা বলতে পারলে তিনি আবারও তার প্রতিবাদ করতেন।
এআরএম