শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কাজী নজরুলের লেখা যে চিঠির বয়স আজ ১০০ বছর

ড. হাফিজ রহমান
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

কাজী নজরুলের লেখা যে চিঠির বয়স আজ ১০০ বছর
ড. হাফিজ রহমান ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

সপ্তম পর্ব

বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে (চিঠিতে ‘নাহার’ সম্বোধন) লিখিত কাজী নজরুল ইসলামের এই দীর্ঘ ও গভীর চিঠিটি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এই পত্রটিতে রোমান্টিকতা ও দর্শনের নবরূপ লক্ষ্য করা যায়। পত্রটি কবির তরফ থেকে একজন ব্যক্তিকে লেখা হলেও এটি কোনো ব্যক্তিগত পত্র নয়। প্রকৃতার্থে, চিঠিটি কবির জীবনদর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং শৈল্পিক চেতনার অনন্য দলিল। চিঠিটি লেখার মূল প্রেক্ষাপট ছিলো কাজী নজরুল ইসলামের চট্টগ্রাম (চট্টলা) ভ্রমণ। কবি চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে কাব্যানুরাগী শামসুন্নাহার মাহমুদ ও তার ভাই হাবিবুল্লাহ বাহার (চিঠিতে ‘বাহার’) পরিবারের সাথে এক নিবিড় প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের দেয়াল ভেঙে কিশোরী শামসুন্নাহার কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ প্রকাশ করেন। এবং কিছুকাল পরেই কবিকে চিঠি লিখে তার জীবন, কবিতা ও সৃষ্টির উৎস সম্পর্কে জানতে চান। কলকাতা হয়ে কৃষ্ণনগরে ফেরার পর কবি শামসুন্নাহারের সেই কৌতূহলোদ্দীপক চিঠির উত্তর হিসেবে ১১-০৮-১৯২৬ তথা এখন থেকে ১০০ বছর আগে কবি এই পত্রটি লেখেন। এখানে উল্লেখ্য, কবি এখানে তৎকালীন নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের (মিসেস আর. এস. হোসেন) কথা উল্লেখ করে কবি শামসুন্নাহারের পড়াশোনার প্রতি অনুরাগ এবং পারিবারিক বাধার প্রতি ইংগিত করেছেন। এই চিঠির মূলকথা হলো-আত্মিক সম্পর্ক ও সৃষ্টির স্বাধীনতা। কবি দেখাতে চেয়েছেন যে, মানব-মন কোনো গণ্ডির মধ্যে বা সামাজিক কৃত্রিম নিয়মে বাঁধা পড়তে চায় না। বাহ্যিক লৌকিকতা বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে হৃদয়ের আকর্ষণ এবং শৈল্পিক বোঝাপড়া অনেক বেশি গভীর। কবির মতে, সমাজ ও সংসারের ‘প্রয়োজন’ বা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ যখন কেবল ‘প্রীতি ও সুন্দরের’ আরাধনা করে, তখনই জীবনের সার্থকতা প্রকাশ পায়। তিনি নাহার এবং বাহারের মধ্যে সেই নিষ্কাম সুন্দরের প্রকাশ দেখেছেন বলেই, নিজের অন্তরের কথাগুলো অসংকোচ প্রকাশ করেছেন। পাঠকের কৌতূহল নিবারণের লক্ষ্যেই চিঠিটি হুবহু এখানে তুলে ধরা গেলে ভালো হতো। তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এই পত্রে কবি এতো বেশি সাহিত্যের উপাদান জড়ো করেছেন, যার কিছু  কিছু ব্যাখ্যা না করলে, অপূর্ণ রয়ে যাবে। তাই, পত্রটি কয়েকটি পর্বে ব্যাখ্যা করা হবে। 

বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদকে লিখিত। ১৩৪৩ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ‘চিঠি’ শিরোনামে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল; তার শেষে পাদটীকায় বলা হয়েছিল: চিঠিখানি কবি নজরুল ইসলাম তাঁর প্রতি শ্রদ্ধান্বিত কোনো বালিকাকে কয়েক বৎসর আগে লিখেছেন।

কৃষ্ণনগর
১১-৮-২৬
সকাল
স্নেহের নাহার,
কাল রাত্তিরে ফিরেছি কলকাতা হতে। চট্টগ্রাম হতে এসেই কলকাতা গেছলাম। এসেই পড়লাম তোমার দ্বিতীয় চিঠি-অবশ্য তোমার ভাবীকে লেখা। আমি যেদিন তোমার প্রথম চিঠি পাই, সেদিনই-তখনই কলকাতা যেতে হয় মনে করেছিলাম কলকাতা গিয়ে উত্তর দেবো। কিন্তু কলকাতার কোলাহলের মধ্যে এমনই বিস্মৃত হয়েছিলাম নিজেকে যে কিছুতেই উত্তর দেবার অবসর করে নিতে পারিনি। তাছাড়া ভাই, তুমি অত কথা জানতে চেয়েছ, শুনতে চেয়েছ, যে কলকাতার হট্টগোলের মধ্যে সে বলা যেন কিছুতেই আসত না। আমার বাণী হট্টগোলকে এখন রীতিমতো ভয় করে, মুক হয়ে যায় ভীরু বাণী আমার-ঐ কোলাহলের অনবকাশের মাঝে। চিঠি দিতে দেরি হলো বলে তুমি রাগ কোরো না ভাই লক্ষ্মীটি। এবার হতে ঠিক সময়ে দেবো, দেখে নিও। কেমন? বাহারটাও না জানি কতো রাগ করেছে, কী ভাবছে। আর তোমার তো কথাই নেই, ছেলেমানুষ তুমি, পড়তে না পেয়ে তুমি এখনো কাঁদো। বাহার যেন একটু চাপা, আর তুমি খুব অভিমানী না? কী যে করেছ তোমরা দুটি ভাই-বোনে যে এসে অবধি মনে হচ্ছে যেন কোথায় কোনো নিকটতম আত্মীয়কে আমি ছেড়ে এসেছি। মনে সদাসর্বদা একটা বেদনার উদ্বেগ লেগেই রয়েছে। অদ্ভুত রহস্যভরা এই মানুষের মন। রক্তের সম্বন্ধকে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই যার, সে-ই কখন পথের সম্বন্ধকে সকল হৃদয় দিয়ে অসঙ্কোচে স্বীকার করে নেয়। ঘরের সম্বন্ধটা রক্তমাংসের, দেহের কিন্তু পথের সম্বন্ধটা হৃদয়ের অন্তরতম-জনার। তাই ঘরের যারা, তাদের আমরা শ্রদ্ধা করি, মেনে চলি, কিন্তু বাইরের আমার-জনকে ভালোবাসি, তাকে না-মানার দুঃখ দিই। ঘরের টান কর্তব্যের, বাইরের টান প্রীতির-মাধুর্যের। সকল মানুষের মনে সকল কালের এই বাঁধনহারা মানুষটি ঘরের আঙিনা পেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছে। যে নীড়ে জন্মেছে এই পলাতক, সেই নীড়কেই সে অস্বীকার করেছে সর্বপ্রথম উড়তে শিখেই! আকাশ আলো কানন ফুল, এমনি সব না-চেনা জনেরা হয়ে ওঠে তার অন্তরতম। বিশেষ করে গানের পাখি যারা, তারা চিরকেলে নিরুদ্দেশ দেশের পথিক। কোকিল বাসা বাঁধে না, ‘বৌ কথা কও’-এর বাসার উদ্দেশ্য আজো মিলল না, ‘উহু উহু চোখ গেল’ পাখির নীড়ের সন্ধান কেউ পেল না! ওদের আসা-যাওয়া একটা রহস্যের মতো। ওরা যেন স্বর্গের পাখি, ওদের যেন পা নেই, ধূলার পৃথিবীতে যেন বসবে না, ওরা যেন ভেসে-আসা গান। তাই ওরা অজানা ব্যথার আনন্দে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দেশে বিদেশে, বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে। ওরা যেন স্বর্গের প্রতিধ্বনির টুকরার-আনন্দের উল্কাপিণ্ড! সমাজ এদের নিন্দা করেছে, নীতিবাগীশ বায়স তার কুৎসিত দেহ-ততোধিক কুৎসিত কণ্ঠ নিয়ে এর ঘোর প্রতিবাদ করেছে, এদের শিশুদের ঠুকরে ‘নিকালো হিঁয়াসে’ বলে তাড়িয়েছে, তবু আনন্দ দিয়েছে এই ঘর-না-মানা পতিতের দলই। নীড়-বাঁধা সামাজিক পাখিগুলি দিতে পারল না আনন্দ, আনতে পারল না স্বর্গের আভাস, সুরলোকের গান...।

এত কথা বললাম কেন, জানো? তোমাদের যে পেয়েছি এই আনন্দটাই - আমায় এই কথা কওয়াচ্ছে, গান গাওয়াচ্ছে। বাইরের পাওয়া নয়, অন্তরের পাওয়া। গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে। মুকুল-আসা কুসুম-ফোটা বসন্তই পাখিকে গান-গাওয়ায়, ফল-পাকা জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় নয়। তখনো পাখি হয়তো গায়, কিন্তু ফুল যে সে ফুটতে দেখেছিল, গন্ধ সে তার পেয়েছিল-গায় সে সেই আনন্দে, ফল পাকার লোলুপতায় নয়। ফুল ফুটলে পায় গান, কিন্তু ফল পাকলে পায় খিদে; আমি পরিচয় করার অনন্ত ঔৎসুক্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানুষের মাঝে, কিন্তু ফুল-ফোটা মন মেলে না ভাই, মেলে শুধু ফল-পাকার ক্ষুধাতুর মন। তোমাদের মধ্যে সেই ফুল-ফোটানো বসন্ত, গান-জাগানো আলো দেখেছি বলেই আমার এত আনন্দ, এত প্রকাশের ব্যাকুলতা। তোমাদের সাথে পরিচয় আমার কোনো প্রকার স্বার্থের নয়, কোনো দাবির নয়। ঢিল মেরে ফল পাড়ার অভ্যেস আমার ছেলেবেলায় ছিল, যখন ছিলাম ডাকাত, এখন আর নেই। ফুল যদি কোথাও ফোটে, আলো যদি কোথাও হাসে সেখানে আমায় গান গাওয়ায় পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম এবার চট্টলায়, তাই গেয়েছি গান। ওর মাঝে শিশিরের করুণা যেটুকু, সেটুকু আমার আর কারুর নয়। 

এখানে কবির আত্মদর্শন, প্রকৃতি ও মানবসম্পর্ক একাকার হয়ে গেছে। ভাষা, ভাব, অলংকার এবং আবেগ-সব মিলিয়ে এটি বাংলার পত্র-সাহিত্যের অন্যতম উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য সমুজ্জল। প্রথমত, লেখাটির ভাষা অত্যন্ত সজীব, কাব্যিক ও সংগীতধর্মী। সাধারণ একটি সৌজন্যবোধ যেমন- ‘চিঠি দিতে দেরি হলো’ এমন একটি বাক্য দিয়ে পত্রটি শুরু হলেও লেখক দ্রুত ব্যক্তিগত কথোপকথনকে মানবজীবনের গভীর উপলব্ধিতে উন্নীত করেছেন। কথ্য ভাষার আন্তরিকতা ‘রাগ কোরো না ভাই লক্ষ্মীটি’ এবং কাব্যিক ভাষার সৌন্দর্য ‘আমার বাণী হট্টগোলকে এখন রীতিমতো ভয় করে’ পাশাপাশি অবস্থান করে ভাষাকে করেছে ব্যঞ্জনাধর্মী ও শিল্পসম্মত। তবে পত্রাংশটি শুধু নয়, বরং সমগ্র লেখাটির মূল শক্তি এর দার্শনিক গভীরতা। লেখক রক্তের সম্পর্ক ও হৃদয়ের সম্পর্কের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরেছেন। কবির বক্তব্য: ‘ঘরের সম্বন্ধটা রক্তমাংসের, দেহের; কিন্তু পথের সম্বন্ধটা হৃদয়ের’ এমন স্বতঃসিদ্ধ উক্তি নিঃসন্দেহে মানবসম্পর্কের সর্বজনীন সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে সার্বজনীন জীবনদর্শনে পরিণত হয়েছে, যা উচ্চমানের সাহিত্যের একটি প্রধান লক্ষণ। পত্রের এই প্রথম অংশেও প্রকৃতিচিত্র ও প্রতীকের ব্যবহার লেখাটিকে অসাধারণ শিল্পগুণ দিয়েছে। কোকিল, ‘বৌ কথা কও’, ‘উহু উহু চোখ গেল’ পাখি, ফুল, বসন্ত, আলো, শিশির। এসব উপাদান যেমন প্রকৃতির শুধু প্রাণ নয়; সাথে সাথে এগুলো স্বাধীন সৃজনশীল আত্মা, সৌন্দর্য ও নির্মল মানবিকতার প্রতীকও বটে। বিশেষ করে ‘গানের পাখি গান গায় খাবার পেয়ে নয়; ফুল পেয়ে আলো পেয়ে সে গান গেয়ে ওঠে’। এই বাক্যে শিল্পসৃষ্টির প্রকৃত উৎসকে রূপকধর্মী ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কবি নিজেকে গানের পাখির সাথে তুলনা করেছেন। এখানে মানুষের ভালোবাসা পেলে কবিরা গান গেয়ে ওঠেন। এমন একটি চমৎকার বর্ণনা কবি দিয়েছেন। অর্থাৎ, কবিরা চান, প্রেম। ভালোবাসা। কবিরা সাড়ম্বরে ভোজন-ভজনে সময় কাটাতে চান না। অথবা, আপ্যায়নে ত্রুটি হলে কলহ বাধিয়ে দেন না। মনের ও পেটের ক্ষুধা নিবৃতি বিষয়ে কবির দার্শনিক উক্তি- ‘ফুল ফুটলে পায় গান, কিন্তু ফল পাকলে পায় খিদে; আমি পরিচয় করার অনন্ত ঔৎসুক্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানুষের মাঝে, কিন্তু ফুল-ফোটা মন মেলে না ভাই, মেলে শুধু ফল-পাকার ক্ষুধাতুর মন।’ সেসময়েও প্রকৃত মানবিক মানুষ খুব অল্পই ছিলো। তাই নাহার-বাহারকে প্রকৃত মানুষ ভেবেই সেখানেই কবির আত্মনিবেদন। ‘তোমাদের মধ্যে সেই ফুল-ফোটানো বসন্ত, গান-জাগানো আলো দেখেছি বলেই আমার এত আনন্দ, এত প্রকাশের ব্যাকুলতা। তোমাদের সাথে পরিচয় আমার কোনো প্রকার স্বার্থের নয়, কোনো দাবির নয়। ঢিল মেরে ফল পাড়ার অভ্যেস আমার ছেলেবেলায় ছিল, যখন ছিলাম ডাকাত, এখন আর নেই। ফুল যদি কোথাও ফোটে, আলো যদি কোথাও হাসে সেখানে আমায় গান গাওয়ায় পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম এবার চট্টলায়, তাই গেয়েছি গান। ওর মাঝে শিশিরের করুণা যেটুকু, সেটুকু আমার আর কারুর নয়।’ 

পত্রের এই অংশেও কবির অন্যান্য লেখার মতোই অলংকারের সার্থক প্রয়োগ লক্ষণীয়। রূপক, উপমা, মানবায়ন ও পুনরুক্তির মাধ্যমে এই পরিচ্ছেদটিও কাব্যময় হয়ে উঠেছে। যেমন: ‘ওরা যেন স্বর্গের পাখি’, ‘ওরা যেন ভেসে-আসা গান’, ‘স্বর্গের প্রতিধ্বনির টুকরার-আনন্দের উল্কাপিণ্ড’। এসব চিত্রকল্প পাঠকের কল্পনাকে বিস্তৃত করে এবং গদ্যকে কাব্যের উচ্চতায় উন্নীত করে।

চলবে...

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর