Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‘প্রজেক্ট’ খুলে চাঁদাবাজি, টার্গেটে বিত্তবানরা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় দুইজনকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তে দেশে নতুন কয়েকটি চাঁদাবাজ চক্রের সন্ধান মিলেছে। এসব চক্রের সদস্যরা বিত্তবান ও ভালো আয় করেন- এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করে প্রথমে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি তাদের এই চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ডের নাম দিয়েছে ‘প্রজেক্ট’। মূলত যেসব বিত্তবান ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা মান-সম্মানের ভয়ে হুমকির বিষয়টি প্রকাশ করবেন না কিংবা আইনি প্রতিকার চাইবেন না-এমন ধরনের মানুষকে টার্গেট করেন চক্রের সদস্যরা।

গত কয়েক দিনে রাজধানীতে অন্তত তিনজন চিকিৎসককে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়ার তথ্য পেয়েছে ডিবি। তাদের মধ্যে একজন হলেন হামলার শিকার অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান। অপর দুই চিকিৎসকের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের একজন রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

ডা. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় এর আগে পল্টন থানা পুলিশ ইবান ও জীবন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে। তারা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ওই হামলার তদন্ত করতে গিয়েই চিকিৎসকদের চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি ডিবির নজরে আসে।

যেভাবে বিত্তবানদের টার্গেট করেন তারা

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, চক্রের সদস্যরা প্রথমে টাকাওয়ালা বা ভালো আয় করেন- এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন। এরপর টার্গেটকৃত ব্যক্তির পুরো নাম, বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, বাসা বা ফ্ল্যাটের অবস্থান, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব এবং পেশাগত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে।

তথ্য সংগ্রহের পর সেগুলো যাচাই-বাছাই করে টার্গেট করা ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপর ফোন কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে চাঁদা দাবি করে। ভয় পেয়ে কেউ কেউ তাদের দাবিকৃত অর্থও দিয়েছেন বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

ডিবি কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশে গড়ে ওঠা এসব চক্র এখনো পুরোপুরি পেশাদার হয়ে ওঠেনি। ফলে কর্মকাণ্ড শুরু করার অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের কয়েকজন সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। তবে ডিবি জানতে পেরেছে, এই চক্রের বাইরেও আরও কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। দেশের বাইরে থাকা একজন হোতা এসব গ্রুপের কয়েকটিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

মন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনের সময়েও চাঁদা চেয়ে খুদে বার্তা!

আহত চিকিৎসককে দেখতে গত শনিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাসপাতালে যাওয়ার সময়ও চক্রটির একজন সদস্য হোয়াটসঅ্যাপে চিকিৎসককে খুদে বার্তা পাঠিয়ে চাঁদা দাবি করে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। ওই সময়ও চক্রটির একজন সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার ছিলেন। এ কারণে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, চক্রটির আরও সদস্য এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং গ্রেফতারের পরও তারা একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

ডিবি বলছে, চক্রটি কোনো ব্যক্তির কাছে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা দাবি করেনি। এ কারণে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তারা এখনো বড় কোনো পেশাদার চাঁদাবাজ চক্রে পরিণত হয়নি। দেশি ও বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা চাঁদা দাবি ও হুমকি দিয়ে আসছিল।

কে এই সানি সাহা

গ্রেফতার সানি সাহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, সানি সাহা আগে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

তিন বছর আগে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। সেখানে আলমগীর নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তাকে মানি লন্ডারিংয়ের অর্থ সিঙ্গাপুরে আনার প্রস্তাব দেন। মূলত হুন্ডি ব্যবসায় যুক্ত হয়ে সানি সাহা প্রায় পাঁচ কোটি টাকা লোকসান করেন বলে ডিবিকে জানিয়েছেন।

পরে দেশে ফিরে রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় আলমগীরের সঙ্গে আবারো দেখা হয় তার। তখন আলমগীর তাকে ‘প্রজেক্ট’ নামে নতুন ধরনের একটি অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনার কথা জানান। এর জন্য বিত্তবান ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় সানি সাহাকে। সানি সাহা এ কাজে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে যুক্ত করেন। তাদের কাজ ছিল সম্ভাব্য টার্গেট ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।

গ্রেফতার লাবিব যা জানিয়েছে

গ্রেফতার ফাতিন ইসরাক লাবিব ডিবির কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

imrul
ডা. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করে পল্টন থানা পুলিশ।

লাবিব জানিয়েছে, ভুক্তভোগী চিকিৎসক আসাদুর রহমানের ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী সানি সাহা। চিকিৎসকের সঙ্গে ফুড ডেলিভারির মাধ্যমে সানির পরিচয় হয়। পরিচয়ের কয়েকদিন পর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সরাসরি সাক্ষাৎ করেন তারা। পরে ফাতিন ইসরাক লাবিব অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানের ওপর হামলার জন্য আবু বকর, রাতুল, ইবান, জীবন ও সাব্বিরকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে তার সঙ্গে কাজ করতে বলেন। পরবর্তীতে তারা সবাই মিলে ডাক্তারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটায়।

‎ডিবি আরও জানায়, সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিবের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা হয়েছে।

চক্রের সন্ধান মিলল যেভাবে

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় গৃত রোববার রাতে শনিরআখড়া গোয়ালপাড়া কদমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে সানি সাহাকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে রাত আড়াইটায় নিকুঞ্জ-২ এলাকা থেকে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে ডিবি জানতে পেরেছে, তাদের বাইরে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন এই কর্মকাণ্ডে জড়িত। তবে তাদের এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

চিকিৎসকদেরও টার্গেট করেছিল চক্রটি

ডিবি জানিয়েছে, গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে পাঁচজন দুষ্কৃতকারী গাড়ি প্রতিরোধ করে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম আমিনুল হককে হুমকি দেয়।

এছাড়া গত ১৭ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় শান্তিনগর এলাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে বের হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান। রাত পৌ্নে ১১টার দিকে একটি অটোরিকশায় ওঠার সময় জীবন ওরফে আদিলসহ কয়েকজন ওই গাড়ির গতিরোধ করে। কারণ জানতে চাইলে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে চিকিৎসককে অটোরিকশা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জীবন ওরফে আদিল চিকিৎসকের ডান চোখে গুরুতর জখম করে। অন্য আসামিরা তার মাথা, দুই চোখের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। তারা চিকিৎসককে ভয়ভীতি ও হুমকিও দেয়।

যা বলছে ডিবি

ডিবির ওয়ারী বিভাগের ডিসি মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা চক্রটির দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছি। তাদেরকে গ্রেফতারের পর জানা গেছে, এমন আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে। আমরা তাদেরও গ্রেফতারে কাজ করছি। যেসব চিকিৎসককে হুমকি দেওয়া হয়েছিল তাদের অভিযোগগুলোও তদন্ত করা হচ্ছে।’

এমআইকে/এমআর