মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৫ পিএম
রাজধানীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদে দন্তচিকিৎসক সারা রোকসানা পিনু (৪২) হত্যা মামলায় তার স্বামী সোহেল রানার দিকে সন্দেহের তীর ঘুরেছে। পুলিশের তদন্তে ঘটনাস্থলে পাওয়া জুতার ছাপের সঙ্গে সোহেল রানার জুতার মিল পাওয়ার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
গত ৩০ জুলাই ফায়দাবাদ এলাকার জামতলা গলির একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে পিনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে পুলিশ ধারণা করেছিল, জানালার গ্রিল কেটে দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে তাঁকে হত্যা করে স্বর্ণালংকার ও টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। পরে তদন্তে সোহেলকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়।
পিনুর স্বজনেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে সোহেলের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য কলহ চলছিল। একাধিক নারীর সঙ্গে সোহেলের সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় পিনুকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও পরিবারের দাবি।

নিহতের স্বজন ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোহেলের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। ঢাকায় একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে সহকারী ম্যানেজার পদে চাকরি করতেন তিনি। পিনু দন্তচিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট পেশায় ছিলেন। বিয়ের পর কয়েক বছর কাজ করলেও পরে স্বামীর চাপে চাকরি ছেড়ে সংসারে মন দেন।
একাধিক নারীর সঙ্গে পরকীয়ার অভিযোগ
পিনুর পরিবারের সদস্যদের দাবি, বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই সোহেলের পরকীয়ার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। সোহেল একাধিক নারীর সঙ্গে ফেসবুকে চ্যাটিং ও ফোনে কথা বলতেন। বিভিন্ন সময়ে পিনু এসবের প্রমাণও পান। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হতো বলে পরিবারের অভিযোগ।
দুই সন্তানের কথা চিন্তা করে পিনু সংসার ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। স্বামীর আচরণ ও নির্যাতনের কথা তিনি নিয়মিত বোন ও বাবা-মাকে জানাতেন।
কাজের মেয়েকেও উত্ত্যক্ত করতেন সোহেল রানা
পিনুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিয়ের তিন বছর পর তাঁদের বাসায় একজন কাজের মেয়ে রাখা হয়। একপর্যায়ে ওই নারী অভিযোগ করেন, সোহেল রাতে তাঁকে উত্ত্যক্ত ও খারাপ কাজের চেষ্টা করতেন। বিষয়টি দুই পরিবার পর্যন্ত গড়ালে সোহেল ক্ষমা চান। পিনুও তাঁর কথা বিশ্বাস করে সংসারে থেকে যান।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে শিক্ষার্থীকে গলা কেটে হত্যা
পরে বাসার নিচতলায় থাকা এক ভাড়াটিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে সোহেলের আচরণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, ওই নারীর দরজার সামনে ফুল, আইসক্রিম, উপহার ও চকলেট রেখে যেতেন সোহেল। চিঠিও দিতেন। বিষয়টি ওই নারী তাঁর স্বামীকে জানানোর পর একপর্যায়ে সোহেলের দেওয়া জিনিসপত্র নিয়ে পিনুর কাছে যান।
পিনু এ বিষয়ে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করতেন। পরে সোহেলের আচরণে ওই ভাড়াটিয়া পরিবার বাসা ছেড়ে চলে যায়। এরপরও তিনি ওই নারীকে ফোন ও মেসেজ পাঠাতেন বলে পরিবারের দাবি।
পিনুর পরিবারের অভিযোগ, এসবের প্রতিবাদ করলে সোহেল তাঁকে মারধর করতেন এবং পরকীয়া নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। তবে দুই সন্তানের কথা ভেবে পিনু সংসার ছাড়েননি।
মামলার বাদী যা বললেন
পিনুর বড় বোন ও মামলার বাদী সারা সুলতানা পলি ঢাকা মেইলকে বলেন, সোহেল একাধিক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত ছিলেন। এসব নিয়ে পিনুকে প্রায়ই মারধর করা হতো। গত পাঁচ বছর ধরে তাঁদের সংসারে ভয়াবহ অশান্তি চলছিল।

তিনি বলেন, পিনু স্বামীর ফোনে একাধিক নারীর সঙ্গে নোংরা চ্যাটিং ও আপত্তিকর কথাবার্তার প্রমাণ পেতেন। প্রতিবাদ করলেই সোহেল তাঁকে ভয় দেখাতেন। তাঁর কারণে বাসার কয়েকজন ভাড়াটিয়াও চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেন পলি।
স্বামীকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন পিনু
পলি বলেন, পিনু তাঁকে প্রায়ই বলতেন, সোহেল একদিন তাঁকে মেরে ফেলতে পারেন। এমনকি কোনোদিন হত্যার শিকার হলে সোহেলকেই যেন সন্দেহ করা হয়, সে কথাও বলতেন তিনি।
একদিনের ঘটনা তুলে ধরে পলি বলেন, পিনু ফোন করে জানিয়েছিলেন, সোহেল তাঁকে মারার জন্য বটি নিয়ে আসছেন। তখন তিনি একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। পলি তাঁকে শান্ত হয়ে সেখানে থাকার পরামর্শ দেন।
সোহেলের নামে জিডি করেছিলেন পিনু
পিনুর পরিবার জানিয়েছে, ২০২১ সালে পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় পিনুকে মারধর করে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দেন সোহেল। মারধরে তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল বলে পরিবারের দাবি। পরে দক্ষিণখান থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করে বোনের বাসায় আশ্রয় নেন তিনি।
তখন তাঁদের মেয়ে সোহেলের বাসায় থাকলেও তিনি শিশুটিকে পিনুর সঙ্গে যেতে দেননি। পরদিন ঈদ ও সন্তানের কথা চিন্তা করে পিনু আবারও ওই সংসারে ফিরে যান।
পিনুর দেখা স্বপ্নই কি সত্যি হলো?
পলি বলেন, মৃত্যুর আগের দিন পিনু তাঁর আরেক বোনকে ফোন করে একটি স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন। স্বপ্নে সোহেল তাঁকে সাদা শাড়ি উপহার দিচ্ছেন—এমনটি দেখেছিলেন তিনি। পিনুর ধারণা হয়েছিল, হয়তো স্বামী ভালো হয়ে গেছেন এবং পরকীয়া থেকে সরে আসছেন।
পলি বলেন, সেই সাদা শাড়িই যে শেষ পর্যন্ত তাঁর কাফনের কাপড় হবে, তা পিনু কল্পনাও করতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর আগের প্রায় ১৫ দিন সোহেল পিনুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছিলেন। পরিবারের ধারণা, পরে তাঁকে হত্যার অভিযোগ থেকে নিজেকে আড়াল করতেই সোহেল এমন আচরণ করে থাকতে পারেন।
পুলিশ যা বলছে
এ ঘটনায় দক্ষিণখান থানার এসআই ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা তাকেই সন্দেহ করছি। তবে তিনি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছেন না। তদন্ত চলছে। আশা করছি, তদন্তে ভালো কিছু বেরিয়ে আসবে। তিনি বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

থানা সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ পিনুর বোন, বাবা-মা ও অন্যান্য স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছে। পিনু ও তাঁর স্বামী কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, ফোনে কাদের সঙ্গে চ্যাটিং করতেন—এসব যাচাই করা হচ্ছে। দুজনের ফোনও জব্দ করা হয়েছে। সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করছে পুলিশ।
গত ৩০ জুলাই বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে পিনুর আট বছরের মেয়ে ওয়ামী তাঁর মাকে বিছানায় মুখের ওপর বালিশ চাপা অবস্থায় নিথর পড়ে থাকতে দেখে। পরে সে স্কুলে ফিরে শিক্ষকদের বিষয়টি জানায়। স্কুলের অধ্যক্ষ বিষয়টি পিনুর স্বামীকে জানালে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
পরদিন পিনুর বোন সারা সুলতানা হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ডাকাতি বলে প্রচার করা হয়েছিল। দাবি করা হয়েছিল, জানালার গ্রিল কেটে দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে আলমারি থেকে আনুমানিক ২০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে।
এমআইকে/এআর