একে সালমান
১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৩ পিএম
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর শক্তি প্রয়োগের ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এখনো দায়িত্বে আছেন। আন্দোলনের পর বিভিন্ন সময়ে অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা ৭৭ জন পুলিশ সুপারের (এসপি) মধ্যে ৩৫ জন এখনো বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ ওই সময়ে দায়িত্ব পালন করা এসপিদের প্রায় ৪৫ শতাংশ এখনো স্বাভাবিক দায়িত্বে আছেন।
মেট্রোপলিটন পুলিশ, রেঞ্জ ও জেলা পর্যায়ে আন্দোলন দমনে দায়িত্ব পালন করা মোট ১১৬ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৪১ জন এখনো বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত। তাঁদের কেউ পুলিশ সদর দপ্তর, কেউ এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ, সিআইডি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পুলিশ টেলিকম কিংবা বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন।
অনেকে এখনো সংযুক্ত
৭৭ জন জেলা এসপির মধ্যে ৪২ জন, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ, বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন। এর মধ্যে বরখাস্ত, বদলি ও বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত করার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বড় একটি অংশ এখনো নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।
আরও পড়ুন: পুলিশের ১০ কর্মকর্তাকে বদলি
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার গতি ছিল ধীর। বর্তমানে অনেক কর্মকর্তাকে পুলিশ সদর দপ্তর, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ, সিআইডি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, টেলিকম ও বিভিন্ন ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত বা পদায়ন করা হয়েছে।

কোনো কোনো কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পেয়েছেন।
বিভিন্ন দফতরে ৩৫ এসপি
বর্তমানে বিভিন্ন রেঞ্জ, পিবিআই, সিআইডি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন আন্দোলনের সময় জেলা পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা ৩৫ জন এসপি ও সমমানের কর্মকর্তা।
প্রশিক্ষণ ও ইনসার্ভিস সেন্টারে রয়েছেন পাবনার আকবর আলী মুনসী (লালমনিরহাট), মাদারীপুরের মোহাম্মদ শফিউর রহমান (পিটিসি খুলনা), নেত্রকোনার ফয়েজ আহমেদ (খুলনা আরআরএফ), মৌলভীবাজারের মনজুর রহমান (নোয়াখালী), ভোলার মাহিদুজ্জামান (হবিগঞ্জ), পঞ্চগড়ের এসএম সিরাজুল হুদা (গাজীপুর) এবং নীলফামারীর মোকবুল হোসেন (কুষ্টিয়া)।
আরও পড়ুন: ৩ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার
সিআইডিতে কর্মরত নওগাঁর মুহাম্মদ রাশিদুল হক, শেরপুরের মোনালিসা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন ও লালমনিরহাটের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। পিবিআইয়ে রয়েছেন সুনামগঞ্জের এমএন মোর্শেদ, চুয়াডাঙ্গার আরএম ফয়জুর রহমান ও কুড়িগ্রামের আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম।
শিল্পাঞ্চল পুলিশে রয়েছেন বান্দরবানের সৈকত শাহীন। নৌ পুলিশে খাগড়াছড়ির মুক্তা ধর ও মেহেরপুরের এসএম নাজমুল হক। ট্যুরিস্ট পুলিশে ঠাকুরগাঁওয়ের উত্তম প্রসাদ পাঠক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. ছাইদুল হাসান। টেলিকমে সাতক্ষীরার মতিউর রহমান সিদ্দিকী এবং এন্টিটেররিজম ইউনিটে বরগুনার মো. রাফিউল আলম দায়িত্ব পালন করছেন।
রেঞ্জ ও ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন পদেও রয়েছেন কয়েকজন। টাঙ্গাইলের সাবেক এসপি সরকার মোহাম্মদ কায়সার পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে বেতবুনিয়া ট্রেনিং সেন্টারে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজবাড়ীর জিএম আবুল কালাম আজাদ ও কক্সবাজারের মাহফুজুল ইসলাম এপিবিএনে, নড়াইলের মোহা. মেহেদী হাসান রেলওয়ে পুলিশে এবং পিরোজপুরের মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম সিলেট রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন।
জয়পুরহাটের মোহাম্মদ নূরে আলম বরিশাল রেঞ্জে এবং শেরপুরের আকরামুল হোসেন ও ঝালকাঠির মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল রাজশাহী রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করছেন।
১১ এসপি সাময়িক বরখাস্ত, কারাগারে ৩
আন্দোলনের সময় ৬৪ জেলায় দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে ১১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তৎকালীন ঢাকা জেলার এসপি মো. আসাদুজ্জামানকে পরে ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তারের পর বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্ত হওয়া অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের গোলাম মোস্তফা রাসেল, লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ, যশোরের প্রলয় কুমার জোয়ারদার, সিরাজগঞ্জের আরিফুর রহমান মন্ডল, বগুড়ার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রংপুরের মো. শাহজাহান।
তবে ১১ জন বরখাস্ত হলেও তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন নোয়াখালীর সাবেক এসপি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, কুমিল্লার আব্দুল মান্নান ও বাগেরহাটের আবুল হাসনাত খান। বাকিদের একটি অংশ বিচারাধীন মামলার আসামি হিসেবে আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন।
চাঁনখারপুলে হত্যাকাণ্ড: কর্মকর্তারা এখনো বহাল
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো চাকরিতে বহাল আছেন।
জুলাই আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক ও বর্তমান ৯৫২ পুলিশ কর্মকর্তা আসামি হলেও গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ২৮ জন। এ হিসাবে গ্রেপ্তারের হার ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শহীদ মিনারমুখী আন্দোলনের কারণে চাঁনখারপুলের একাংশসহ আশপাশের বেশির ভাগ এলাকা শাহবাগ থানার অধীন ছিল।
৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সময় রমনা বিভাগে পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) মো. আশরাফুল ইসলাম, রমনা জোনাল টিমের এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও এসি মো. ইমরুল দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া রমনা বিভাগের আওতাধীন নিউমার্কেট জোনাল টিমের এডিসি হাফিজ আল আসাদ, এসি রেফাতুল ইসলাম এবং ধানমন্ডি জোনাল টিমের এডিসি মো. ইহসানুল ফিরদাউস দায়িত্বে ছিলেন।
শাহবাগ থানার ওসি ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান এবং পরিদর্শক (অপারেশন) ছিলেন আরশাদ হোসেন।
একই সময়ে রমনা গোয়েন্দা বিভাগে ডিসি (ডিবি) মো. হুমায়ুন কবীর, এডিসি (অ্যাডমিন) মো. আজহারুল ইসলাম মুকুল, রমনা জোনাল টিমের এডিসি মিশু বিশ্বাস, এসি জাবেদ ইকবাল প্রীতম এবং ধানমন্ডি জোনাল টিমের এডিসি ছিলেন মো. ফজলে এলাহী।
আরও পড়ুন: ডিআইজি-অতিরিক্ত ডিআইজিসহ ১৭ পুলিশ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে
এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মাদক নিয়ন্ত্রণ টিমের এডিসি ছিলেন নাজিয়া ইসলাম। প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনিও হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সদর দফতরের
অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান পদক্ষেপের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অ্যাডিশনাল আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সরাসরি সক্রিয় বা জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছেন, আন্দোলনে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।
একেএস/এআর