Dhaka Mail Logo

জাতীয়

সন্তান হারিয়ে দিশেহারা বাবা, গলায় বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে ঘুরছেন পথে পথে

মাহফুজুর রহমান

১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

এক হাতে সন্তানের হারানো বিজ্ঞপ্তির লিফলেট, গলায় ঝোলানো বড় একটি ব্যানার। ব্যানারে ছেলের মুখের ছবি, নাম-পরিচয়, ঠিকানা আর কয়েকটি ফোন নম্বর। রাজধানীর এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় হেঁটে চলেছেন একজন বাবা। পথচারীদের থামিয়ে দেখাচ্ছেন ব্যানারটি। কারও মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইছেন ‘এই ছেলেটাকে কি কোথাও দেখেছেন?’

তার ছেলেটির নাম নারায়ণ দেবনাথ বর্ষণ (অনু), বয়স ১৯ বছর । বাকপ্রতিবন্ধী। ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতাও রয়েছে। গত ৯ আগস্ট রাজধানীর বাসাবোর তিলপাপাড়া কালভার্ট মন্দিরসংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন বাবা। চার দিন ধরে সন্তানের কোনো সন্ধান নেই। তাই পুলিশের কাছে সাধারণ ডায়েরি করার পাশাপাশি নিজের হাতে সন্তানের হারানো বিজ্ঞপ্তি ছাপিয়ে এখন নিজেই তা গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় নেমেছেন তিনি।

অনুর বাবার এই ছুটে চলার দৃশ্য দেখলে বোঝা যায়, সন্তান হারানোর কষ্ট কতটা অসহায় করে দিতে পারে একজন মানুষকে। কোথায় গেলে ছেলে পাওয়া যেতে পারে, কার কাছে খবর মিলতে পারে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবুও থামছেন না। কারণ তার কাছে এখন প্রতিটি রাস্তা সম্ভাবনার, প্রতিটি অপরিচিত মানুষ সম্ভাব্য একটি খবরের বাহক।

অনুর বাবা বলেন, ‘আমার বাচ্চাটা তো এখন নিখোঁজ। ও কথা বলতে পারে না। নিজের কথা ঠিকমতো বোঝাতেও পারে না। তাই ও কোথায় আছে, কোন জায়গায় গিয়ে আছে কিছুই জানি না। যে জায়গাগুলোতে এ ধরনের বাচ্চারা থাকতে পারে, সেসব জায়গায়ও খুঁজছি। এই জন্যই সব জায়গায় এই সাইনবোর্ডটা নিয়ে ঘুরছি।’

তিনি বলেন, ‘৯ তারিখে আমার ছেলে হারিয়ে যায়। আমি ১০ তারিখে সবুজবাগ থানায় জিডি করার পর থেকে গলায় এ সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে খুঁজতে বের হয়েছি। সবুজবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী ও হাতিরঝিলের অলি গলিতে খুঁজেছি। আজকে সারাদিনে তালতলা, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, কারওয়ান বাজারসহ আরও জায়গায় খুজতেছি।

সন্তানটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে উৎকণ্ঠায়। কখনো মনে হচ্ছে, হয়তো কোনো জায়গায় একা বসে আছে অনু। আবার কখনো মনে হচ্ছে, হয়তো কেউ তাকে কোথাও দেখেছেন। সেই আশাতেই রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়াচ্ছেন বাবা।

অনুকে হারানোর দিনের ঘটনা বলছিলেন অনুর বাবা, ‘৯ তারিখে উত্তর বাসাবোর স্থানীয় ইভিনিং মার্কেটে পরিবারের সঙ্গে যাওয়ার সময় অনু কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, সে হয়তো আমাদের সঙ্গেই আছে। কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে ফিরে অনুকে দেখতে না পেয়ে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। পরে ওকে না পেয়ে আমরা চিৎকার করে পিছনের দিকে খুঁজতে শুরু করি।’

‘তারপর আজ ৫ দিন হয়ে গেলো বর্ণকে আমরা খুঁজে পাছি না।’

অনুর বাবা জানেন, তার ছেলে যদি কারও কাছে নিজের নাম বা ঠিকানা ঠিকভাবে বলতে না পারে, তাহলে তাকে পরিবারের কাছে ফেরানো কঠিন হতে পারে। তাই তিনি চান, যত বেশি মানুষ অনুর ছবি দেখবেন, তত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে তাকে চিনে ফেলার।

সেই কারণেই ব্যানারটি শুধু দেয়ালে বা খুঁটিতে লাগিয়ে রাখেননি তিনি। নিজের গলায় ঝুলিয়েছেন। যেন চলতে চলতেই সন্তানের খোঁজের বিজ্ঞপ্তি মানুষের চোখে পৌঁছে দিতে পারেন।

রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ ছুটে চলেন নিজেদের কাজে। সেই ভিড়ের মধ্যেই এক বাবা ছেলের ছবি বুকে নিয়ে হাঁটছেন। কারও কাছে হয়তো এটি একটি সাধারণ হারানো বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু বাবার কাছে এই ছবিটিই এখন তার সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ।

কেউ ব্যানারটি দেখে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াচ্ছেন। কেউ ফোন নম্বরের ছবি তুলে রাখছেন। কেউ আবার অনুর বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, ‘ইনশাআল্লাহ, পাওয়া যাবে।’ এই সামান্য কথাগুলোই এখন তার জন্য বড় ভরসা।

অনুর বাবার চোখে-মুখে ক্লান্তি। দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ানোর পরও যেন বিশ্রামের সুযোগ নেই। কারণ তিনি জানেন, তিনি যদি ঘরে বসে থাকেন আর তার সন্তান কোথাও একা পড়ে থাকে, তাহলে হয়তো খোঁজ পাওয়ার একটি সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে।

তাই গলায় ব্যানার ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন তিনি। কখনো বাজারে, কখনো মানুষের ভিড়ে, কখনো অচেনা কোনো এলাকায়। প্রতিটি জায়গায় একই প্রশ্ন ‘আমার ছেলেটাকে কি দেখেছেন?’

ব্যানারে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুর বয়স ১৯ বছর। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। পরনে ছিল হালকা গোলাপি-কালো গেঞ্জি ও জিন্স থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। মুখে হালকা দাড়ি রয়েছে। ১০ আগস্ট বাসাবোর তিলপাপাড়া কালভার্ট মন্দিরসংলগ্ন এলাকা থেকে সে নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় সবুজবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

কেউ অনুকে কোথাও দেখে থাকলে পরিবারের দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। যোগাযোগ নম্বর- ০১৭১৯-২০৬৯১৫, ০১৯৪৩-৮৬১৯৮৬, ০১৭১৮-৩৭৯৫৯৪ ও ০১৭২৮-৪৪০৪১১।

তবে অনুর বাবার কাছে ফোন নম্বরগুলো এখন আশার দরজা। দিনের যেকোনো সময় যদি একটি ফোন আসে ‘আপনার ছেলেকে দেখেছি’ তাহলেই হয়তো থেমে যাবে তার ছুটে চলা।

সন্তান হারানোর পর একজন বাবা কী করতে পারেন এই প্রশ্নের উত্তর যেন নিজের শরীরেই লিখে নিয়েছেন তিনি। সন্তানের ছবি গলায় ঝুলিয়ে রাজধানীর পথে পথে হাঁটছেন। তার হাতে নেই কোনো নিশ্চয়তা, নেই কোথায় খুঁজলে ছেলে মিলবে তার কোনো ঠিকানা। আছে শুধু একটাই বিশ্বাস কোনো একজন মানুষ হয়তো তার সন্তানের ছবিটি চিনবেন।

আর সেই একজন মানুষের একটি ফোনকলই হয়তো আবার অনুর বাবার গলায় ঝোলানো ব্যানারটি নামিয়ে দিতে পারে।

ফিরিয়ে দিতে পারে তার ১৯ বছরের সন্তানকে।

এম/এমআই