Dhaka Mail Logo

জাতীয়

আইন মানছে না অধিকাংশ তামাক কোম্পানি: টিসিআরসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেওয়ার হার বাড়লেও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আকার ও অন্যান্য শর্ত মানছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান।  গবেষণা বলছে, তামাকজাত পণ্যের ৮৮ শতাংশ মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী থাকলেও আইন অনুযায়ী মোড়কের ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সতর্কবাণী রয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশে। আবার ৭৩ শতাংশ মোড়কের উভয় পাশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। এছাড়া তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদনের তারিখ ও ট্রেড লাইসেন্স নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।  ৩৯৪টি মোড়ক পর্যবেক্ষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি)।

রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর একটি সম্মেলন কক্ষে ‘আইন অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন: বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট ও টিসিআরসি যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

গবেষণায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে ৩৯৪টি তামাকজাত পণ্যের মোড়ক পর্যবেক্ষণ করা হয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫-এর ধারা ১০ এবং পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা, ২০২১-এর সংশ্লিষ্ট বিধানকে গবেষণার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেওয়ার হার ৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে সতর্কবাণী থাকলেও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।

বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। গবেষণায় ২৯৭টি জর্দার মোড়ক পরীক্ষা করে মাত্র ২৮ শতাংশে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পাওয়া গেছে। ২০টি গুলের মোড়কের কোনোটিতেই নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সতর্কবাণী ছিল না।

গবেষণায় মোড়কে বাধ্যতামূলক তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ৩৯৪টি মোড়কের মাত্র ১৬ শতাংশে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য এবং ৫৫ শতাংশে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ ছিল। ৮০ শতাংশ মোড়কে ট্রেড লাইসেন্স নম্বর পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ব্র্যান্ডের নাম বা স্ট্যাম্প দিয়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর অংশবিশেষ ঢেকে রাখা, খোলা তামাক ও খুচরা শলাকা বিক্রি এবং নিম্নমানের মোড়ক ব্যবহারের মতো অনিয়মও পাওয়া গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে এসব অনিয়মের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে টিসিআরসির প্রকল্প কর্মকর্তা বিভূতী ভূষণ মাহাতো বলেন, তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আকার ও অন্যান্য শর্ত মেনে দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের ঘাটতি বেশি।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের সদস্য ও ‘সেতু’র প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানা বলেন, নতুন সংশোধিত আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে ৭৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও মানসম্মত মোড়ক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী যেন আইন অনুযায়ী মোড়কের ওপর মুদ্রণ করা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের মোড়কে আইন বাস্তবায়নের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। জর্দা ও গুলসহ এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কার্যকর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, টিসিআরসি ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর এই গবেষণা পরিচালনা করছে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে তামাকজাত পণ্যের মোড়কে অবৈধভাবে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার বন্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। নতুন বিধিমালা প্রণয়নেও এ গবেষণার ফলাফল ভূমিকা রাখবে।

গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ১০ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংশোধিত আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, মানসম্মত মোড়ক চালু, খুচরা শলাকা ও খোলা তামাক বিক্রি বন্ধ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইন লঙ্ঘনকারী তামাকপণ্য জব্দ ও ধ্বংস করা।

এছাড়া সব তামাক কোম্পানিকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অধীনে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, উৎপাদনের তারিখ, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্যসহ বাধ্যতামূলক তথ্য সঠিকভাবে মুদ্রণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এএইচ/এএম