দেশের ৭৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন বিদ্যমান। এরমধ্যে ৯১ শতাংশে ব্র্যান্ড প্রচারণা, ৬৮ শতাংশে ব্র্যান্ডিং সামগ্রী ব্যবহার, ৯০ শতাংশে দৃশ্যমানভাবে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন, ৭১ শতাংশে নতুন ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রচারণা, ৬৭ শতাংশে মূল্যভিত্তিক প্রচারণা এবং ৭৬ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাক কোম্পানির ব্র্যান্ডযুক্ত সাইনবোর্ড রয়েছে। টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে পরিচালিত হয়। এতে মোট ৭০০টি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন এবং ৮১৯টি তামাক বিক্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণাটি বলছে, বিক্রয়কেন্দ্রগুলো এখনো তামাক কোম্পানিগুলোর অন্যতম প্রধান বিপণন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সারা দেশের বিক্রয়স্থলে সিগারেট কোম্পানিগুলো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সুপরিকল্পিতভাবে ভঙ্গ করছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে ২টি বিদেশি কোম্পানি। আইন বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও রয়েছে।
গবেষণা এও বলছে, দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের হার গত বছরের (২০২৫) তুলনায় চলতি বছরে কমে এসেছে। এক্ষেত্রে খুলনায় কমেছে ১৯%, রংপুরে কমেছে ১৮%, রাজশাহীতে কমেছে ১১%, ঢাকা ও সিলেটে কমেছে ১০% এবং চট্টগ্রামে কমেছে ৫%।
গবেষণায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সি ব্যক্তির কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা হয়েছে এবং ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সি ব্যক্তিদের দিয়েই তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করানো হয়েছে।
গবেষণাটি তুলে ধরেন টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজা। তিনি বলেন, ‘মাত্র ২১ শতাংশ পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ছিল। যেখানে সাইনেজ ছিল, তারও মাত্র ৫২ শতাংশ আইন অনুযায়ী স্থাপন করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষণকৃত ৩৬ শতাংশ স্থানে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা গেছে এবং ৪৮ শতাংশ স্থানে সিগারেট বা বিড়ির ফিল্টার ও অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা ধূমপানের উপস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। ’
‘এছাড়া ১৬ শতাংশ পাবলিক প্লেস ও পরিবহনের ভেতরে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কেন্দ্র পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তামাক বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রদর্শন-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।’
গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে আইন অনুযায়ী ধূমপান নিষিদ্ধ সাইনেজ নিশ্চিত করা, নিয়মিত মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন, ব্র্যান্ডিং ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী ও প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান।
টিসিআরসি’র সদস্য সচিব ও প্রকল্প পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের এনফোর্সমেন্ট এন্ড মনিটরিং কনসালটেন্ট হোসেন আলী খোন্দকার, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মীর আলমগীর হোসেন, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অধিশাখা) মো. মামুনুর রশীদ, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডসের (সিটিএফকে) লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জয়েন্ট সেক্রেটারি মোবারক হোসেন, ঢাকা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. সরকার ফারহানা কবীর, আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সেতুর প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানা, তামাক বিরোধী জোটের দপ্তর সম্পাদক সৈয়দা অনন্যা রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের জন্য আইনের সাথে সম্পৃক্ত সকল মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কার্যকর মিটিংয়ের আয়োজন করার কথা জানান প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ মোমেনা মনি। তিনি ১ মাসের মধ্যে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি বন্ধ করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন,তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। অধিকাংশ পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে আইন অনুযায়ী ধূমপান নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সাইনেজের অভাব, প্রকাশ্যে ধূমপানের প্রবণতা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড প্রচারণা ও দৃশ্যমান প্রদর্শনের ব্যাপক উপস্থিতি এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির ঘটনা আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ জরুরি।
এএম




