Dhaka Mail Logo

জাতীয়

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি, কী পরিবর্তন আসছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ পিএম

বাংলাদেশে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য প্রস্তাবিত আইনের খসড়া প্রকাশের পর নতুন ইউনিটের কাঠামো, ক্ষমতা ও কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে প্রস্তাবিত এসআরবির সঙ্গে বর্তমান র‍্যাব বা এর কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইনটির খসড়া নিয়ে বর্তমানে মতামত নেওয়া হচ্ছে। এরপর প্রয়োজন হলে সংশোধন বা পরিবর্তন করে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে পাস হলে তা আইনে পরিণত হবে। এরপর ওই আইনের ভিত্তিতে র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন করা হবে।

র‍্যাব নিয়ে বিতর্ক

২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র‍্যাব গঠন করা হয়। শুরু থেকেই বাহিনীটির বিরুদ্ধে কথিত ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, র‍্যাব গঠনের পর থেকে ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৩৮০ জন নিহত হন।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। কক্সবাজারের একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের পর র‍্যাব এবং বাহিনীর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানায়। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এসআরবির খসড়ায় কী আছে

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এসআরবি গঠনের প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হবে।

পুলিশ ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠিত হবে। নির্ধারিত শর্তে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে এসআরবিতে সংযুক্ত করা যাবে।

প্রস্তাবিত আইনে এসআরবির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদকদ্রব্য উদ্ধার, সাইবার অপরাধ দমন, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন, গুম, খুন ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

খসড়ায় প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দকরণ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা শীর্ষক অংশে ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন মেনে নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, আলামত জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা এসআরবিকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক, এই আইনের অধীনে তল্লাশি, আটক, জব্দ বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে এসআরবির একজন কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

কোনো সদস্য কাউকে গ্রেপ্তার করলে বা আলামত জব্দ করলে গ্রেপ্তার করা ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত অবিলম্বে নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর করতে হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন ইউনিটকে ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজের জন্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার মহাপরিচালকের হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে। জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারের বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।

নাগরিকের অভিযোগের সুযোগ

প্রস্তাবিত আইনে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। কোনো নাগরিক অভিযোগ করলে তা প্রতিকারের জন্য এই কমিটি কাজ করবে। কমিটির প্রধান হবেন ইউনিটের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।

প্রয়োজনে নাগরিকের অভিযোগ বা ক্ষোভ নিরসনে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ অনুসন্ধান দল গঠন করে বিভাগীয় কার্যপদ্ধতিতে অনুসন্ধান করা যাবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র‍্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গুমসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল।

নতুন কিছু কি যুক্ত হচ্ছে?

মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটনের মতে, র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠন করা হলেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসছে না।

তিনি বলেন, বর্তমান র‍্যাবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার মতোই বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। নতুন মোড়কে পুরোনো ব্যবস্থাই আইনের খসড়ায় রাখা হয়েছে। আগের চেহারারই নতুন বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে।

নূর খান লিটন বলেন, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো র‍্যাব বিলুপ্ত করার পাশাপাশি পুলিশের সদস্যদের নিয়ে বিশেষায়িত দল গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছিল।

তবে প্রস্তাবিত আইনে র‍্যাবের মতো প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও এসআরবিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাজের ধরন এবং প্রশিক্ষণ এক নয়। অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমনে প্রয়োজন হলে পুলিশের সদস্যদের নিয়ে বিশেষায়িত দল গঠন করা উচিত।

নূর খান লিটনের মতে, নতুন আইনেও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ রাখা হয়নি। এটি রাখা জরুরি।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, আগে র‍্যাব মূলত গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করত। তবে প্রস্তাবিত আইনে নতুন ইউনিটকে তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, খসড়ায় নাগরিকদের অভিযোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে যেকোনো নাগরিক অভিযোগ করতে পারবেন। এসব অভিযোগের প্রতিকারে বাহিনীর বাইরের ব্যক্তিদেরও কর্তৃপক্ষ সংযুক্ত করতে পারবে।

তবে নূর খান লিটনের মতে, বাহিনীর বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করার সুযোগ থাকলেও তাঁদের নিয়োগ করবে কর্তৃপক্ষ। ফলে সেখানে কতটা নিরপেক্ষ ব্যক্তি যুক্ত হবেন এবং তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, প্রস্তাবিত এসআরবির ক্ষেত্রে সদস্যদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টি আইনের খসড়ায় জোরালোভাবে এসেছে, যা র‍্যাবের ক্ষেত্রে ছিল না।

তিনি বলেন, স্বচ্ছতার বিষয়টিতে এবার কিছুটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে বাহিনী কীভাবে দ্রুত সাড়া দেবে, সে বিষয়ে খসড়ায় স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়ার ওপর পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে আইনটি আরও পরিমার্জনের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

এআর