নিজস্ব প্রতিবেদক
০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মূল ফটক পেরিয়ে কয়েক কদম এগোলেই চোখ আটকে যায় একটি বিশাল নেমপ্লেটে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে লেখা রয়েছে এই জাদুঘরের দর্শন, নির্মাণের উদ্দেশ্য এবং এর প্রতিটি অংশের পরিচয়। শব্দগুলো পড়তে পড়তে যেন সামনে ভেসে ওঠে এক রক্তাক্ত ইতিহাস, দীর্ঘ প্রতিরোধের কাহিনি এবং আত্মত্যাগে লেখা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। লেখাগুলো যেন একেকটি স্মৃতির দরজা। যে দরজা খুললেই ফিরে আসে জুলাইয়ের দিনগুলো। আর তাই জাদুঘরের প্রবেশমুখের সেই দেয়াল নীরবে বলে দেয়, ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ যেন সত্যিই এমন এক দেয়াল, যে দেয়াল ভুলতে দেয় না জুলাইকে।
জাদুঘরের তথ্যফলকে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট শাসনের ১৬ বছরের দুঃশাসন, নিপীড়ন, গুম, নির্যাতন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নির্মাণ করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। প্রায় ১৮ একরজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণ শুধু একটি জাদুঘর নয়, এটি স্মৃতি ও প্রতিরোধের স্মারক। স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা অক্ষুণ্ন রেখে সাবেক শাসকের বাসভবনকে রূপান্তর করা হয়েছে জনগণের স্মৃতির ঠিকানায়। যে ভবন একসময় ক্ষমতার প্রতীক ছিল, আজ সেটিই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাদুঘরের মূল ভবনের নিচতলায় স্থান পেয়েছে ১৬ বছরের দুঃশাসনের নানা অধ্যায়। সেখানে বিভিন্ন ছবি, দলিল, তথ্য এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে সেই সময়ের নির্যাতন, নিপীড়ন ও গণতন্ত্রের সংকটের ইতিহাস। দ্বিতীয় তলায় সংরক্ষণ করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোর নানা স্মৃতি, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, প্রতিরোধ, আন্দোলন এবং বিজয়ের গল্প। দর্শনার্থীরা প্রতিটি কক্ষে গিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছেন, পড়ছেন দেয়ালে লেখা বিবরণ, দেখছেন আলোকচিত্র আর সংরক্ষিত স্মারক।
প্রবেশের পরই রয়েছে 'ডেমোক্রেসি লং ওয়াক'। এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের নানা উত্থান-পতনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আর 'রোড টু দ্য ফিউচার' অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশা। যেন অতীতের শিক্ষা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ শহীদ স্মৃতি মেমোরিয়াল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী প্রায় চার হাজার শহীদের স্মরণে নির্মিত এই স্মারকের চারপাশে খোদাই করা হয়েছে তাদের নাম। অনেক দর্শনার্থী সেখানে দাঁড়িয়ে নীরবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, কেউ কেউ ফুল রেখে স্মরণ করছেন আত্মত্যাগীদের। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে শহীদ ও বীরদের ভাস্কর্য, যা আন্দোলনের সাহস, ত্যাগ ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাদুঘরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রতীকী ‘আয়নাঘর’। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম ও নির্যাতনের জন্য ব্যবহৃত কথিত গোপন বন্দিশালার আদলে নির্মিত এই অংশটি দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের এক নির্মম চিত্র। সংকীর্ণ কক্ষ, অন্ধকার পরিবেশ এবং উপস্থাপনার ধরন অনেক দর্শনার্থীকেই আবেগাপ্লুত করে তুলছে।
জাদুঘর ঘুরে দেখতে আসা মেহজাবিন হক বলেন, ‘ভেতরে ঢোকার আগে প্রবেশমুখে লেখা কথাগুলো পড়েই আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছে। মনে হয়েছে, আমি কোনো সাধারণ জাদুঘরে নয়, ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিটি অংশ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করবে।’
দর্শনার্থী লাইলা আরজু বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে প্রতীকী আয়নাঘর। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই বোঝা যায়, মানুষ কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। আবার শহীদদের নাম লেখা মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, এই আত্মত্যাগ কখনোই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।’
মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘জাদুঘরের প্রতিটি অংশের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। ডেমোক্রেসি লং ওয়াক, রোড টু দ্য ফিউচার, মূল ভবন, ভাস্কর্য কিংবা মেমোরিয়াল, সবকিছুই একটি ইতিহাসকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে এসে বুঝেছি, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, একটি জাতির স্মৃতি হয়ে দেয়ালেও লেখা থাকে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশের পর যে দেয়ালটি দর্শনার্থীদের প্রথম স্বাগত জানায়, সেখানে লেখা প্রতিটি বাক্য যেন একটি করে অঙ্গীকার। অতীতের নির্যাতন, মানুষের প্রতিরোধ, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে একসঙ্গে ধারণ করে আছে সেই দেয়াল। তাই জাদুঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও দর্শনার্থীদের মনে থেকে যায় একটি অনুভূতি, ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না।
এএইচ/এএম