কেউ চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। কেউ হাতে থাকা মুঠোফোনে নম্বর মিলিয়ে লাল টেলিফোনের বোতাম চাপছেন। আবার কেউ পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কখন খালি হবে টেলিফোনটি। নির্দিষ্ট নম্বরে কল করতেই ভেসে আসছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠ। কখনো অপর প্রান্তে রাজনৈতিক নেতা, কখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথন। পুরোনো সেই টেলিফোন ঘিরেই যেন সবচেয়ে বেশি কৌতূহল দর্শনার্থীদের।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সাবেক গণভবন এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা নিদর্শন, আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন নথিপত্র এবং সেই সময়ের নানা ঘটনার স্মারক নিয়ে সাজানো হয়েছে জাদুঘরটি। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহৃত লাল টেলিফোন হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।
জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার প্রথম দিন সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শেখ হাসিনার অফিসকক্ষের সামনে থাকা লাল টেলিফোনগুলো ঘিরে দর্শনার্থীদের তুমুল আগ্রহ। কেউ একটি কথোপকথন শুনে সরে যাচ্ছেন, আবার কেউ পরের নম্বরটি শুনতে অপেক্ষা করছেন।
সাবেক গণভবনের নিচতলায় শেখ হাসিনার অফিসকক্ষে তিনটি আলাদা টেবিলে রাখা হয়েছে ছয়টি লাল টেলিফোন। প্রতিটি টেবিলের সামনে রয়েছে আলাদা তালিকা। তালিকায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম ও নম্বর দেওয়া রয়েছে। সেই নম্বরে কল করলেই শোনা যাচ্ছে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কথোপকথনের অডিও।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের প্রদর্শন ব্যবস্থায় ছয়টি টেলিফোনে রয়েছে প্রায় শতাধিক কল রেকর্ড। নির্দিষ্ট নম্বর চাপলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কথোপকথনের বড় একটি অংশ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার বলে জানানো হয়েছে।
টেলিফোনগুলোর একটিতে ৭০৮ নম্বরে কল করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নুর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। তালিকায় তাঁর সঙ্গে শেখ হাসিনার পাঁচটি কথোপকথন থাকার তথ্য রয়েছে।
অন্য একটি লাল টেলিফোনে ৭১১ নম্বরে কল করলে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। এই টেলিফোনটির সামনেও বেশ কিছুক্ষণ ধরে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।
লাল টেলিফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ ইয়াসিন নামের এক যুবক। কথোপকথন শোনার পর তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আপাকে একটাই কথা বলি, ভারতে থেকে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। বাংলাদেশে ফিরে আসেন।’
তেজগাঁও থেকে বন্ধুদের সঙ্গে জাদুঘর দেখতে এসেছেন আমিনুল ইসলাম। অন্য প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পাশাপাশি বেশ কিছুক্ষণ তাঁকে লাল টেলিফোনে কথোপকথন শুনতে দেখা যায়।
টেলিফোনে কী শুনেছেন জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৭৭০৮ নম্বরে দেখতে পাচ্ছি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নাম। সাদ্দাম হোসেন বেশ কয়েকবার, প্রায় নয়বার ভয়েস কল করেছেন। অনেক কথা বলছেন। কী করা যায়, কী করতে পারি আপা, এসব বলছেন। উনি (শেখ হাসিনা) বিভিন্নভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন।’
আরেক দর্শনার্থী আব্দুস সালামের কাছেও লাল টেলিফোনের অভিজ্ঞতা ছিল অন্য রকম। তিনি বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে অনেক কিছু দেখলাম। এর মধ্যে লাল টেলিফোনের বিষয়টি ইন্টারেস্টিং লেগেছে। একেকটি নম্বরে কল দিলে একেকজনের সঙ্গে কথোপকথন শোনা যায়। সরাসরি সেই সময়ের কথাগুলো শোনার সুযোগ পাওয়াটা অন্য রকম অনুভূতি।’
শুধু টেলিফোনের কথোপকথন নয়, এই কক্ষের দেয়াল ও আশপাশের প্রদর্শনীর মধ্যেও রয়েছে আওয়ামী লীগ শাসনামলের নানা স্মৃতি। সেখানে বিভিন্ন সময়ে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ছবি কাঠে খোদাই করে প্রদর্শন করা হয়েছে। ফলে একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অফিসের পরিবেশ দেখছেন, অন্যদিকে শুনছেন সেই সময়ের নানা কথোপকথন।
দর্শনার্থীদের আগ্রহের কারণও এখানেই। জাদুঘরের অন্যান্য নিদর্শন যেখানে চোখের সামনে দেখা যায়, লাল টেলিফোনে সেখানে শোনা যাচ্ছে কণ্ঠ। একটি নম্বর, একটি বোতাম চাপা, আর এরপরই কয়েক বছর আগের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কথোপকথন কানে ভেসে আসছে। ফলে দর্শনার্থীদের কাছে এটি কেবল একটি পুরোনো টেলিফোন নয়, বরং অতীতের একটি সময়কে শব্দের মাধ্যমে ফিরে দেখার মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে সাবেক গণভবনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের প্রথম দিনে শুধু জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথিদের প্রবেশের সুযোগ ছিল। বৃহস্পতিবার থেকে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় জাদুঘরটি।
প্রথম দিন সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখার পাশাপাশি লাল টেলিফোনের সামনে ছিল বিশেষ ব্যস্ততা।
দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা চালু করেছে। দর্শনার্থীদের আগে থেকে ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে সময় নির্বাচন করতে হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবেশ ফি ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা টিকিট নিয়ে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। পরে এই সরকারের অধীনেই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গণভবনে তৈরি করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘর।
এএইচ/এআর




