Dhaka Mail Logo

জাতীয়

দেয়ালের ক্যানভাসে জুলাই অভ্যুত্থানের নিপীড়নের নির্মম দলিল

আব্দুল হাকিম

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম

* দেয়ালে-পিলারে প্রতিবাদের ভাষা
* গ্রাফিতিতে ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান
* সময় পেরোলেও মুছে যায়নি রঙ
* দলীয় পোস্টারে ঢেকেছে অনেক গ্রাফিতি
* কোথাও রয়েছে, কোথাও মুছে গেছে স্মৃতি

জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হচ্ছে। সময়ের ব্যবধানে অনেক ক্ষত শুকিয়ে এসেছে, অনেক ঘটনার দৃশ্যপট বদলে গেছে। তবে রাজধানীর দেয়াল, মেট্রোরেলের পিলার আর উড়ালসড়কের নিচের কংক্রিটের গায়ে আঁকা অসংখ্য গ্রাফিতি এখনো যেন সেই দিনগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রঙ-তুলি আর প্রতীকের ভাষায় এসব দেয়ালচিত্রে ফুটে উঠেছে আন্দোলনের উত্তাল দিন, নিপীড়নের ভয়াবহতা, প্রতিরোধের সাহস, স্বজন হারানোর বেদনা এবং একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাই গ্রাফিতিগুলো এখন আর শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক সময়ের জীবন্ত দলিল।

দুই বছর আগের সেই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ, টিএসসি, নীলক্ষেত, ফার্মগেট, আগারগাঁও, মিরপুর, উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আঁকা হয়েছিল অসংখ্য গ্রাফিতি। বিশেষ করে মেট্রোরেলের পিলার, বিভিন্ন সড়কের দেয়াল, ফুটওভারব্রিজের পাশের অংশ এবং জনসমাগমস্থলের কংক্রিট-সবখানে রূপ নেয় একটি উন্মুক্ত শিল্প গ্যালারিতে। কোথাও আহত আন্দোলনকারীকে কাঁধে তুলে নেওয়ার দৃশ্য, কোথাও শোকাহত মায়ের কান্না, কোথাও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণের অবয়ব, আবার কোথাও মুষ্টিবদ্ধ হাত, ভাঙা শিকল কিংবা রক্তিম সূর্যের প্রতীক। এসব দেয়ালচিত্র আজও পথচারীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে, মনে করিয়ে দেয় এক অস্থির সময়ের কথা।

দুই বছর পরও রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে চলতে গেলে চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে আঁকা সেই স্মৃতিচিহ্নগুলো। মেট্রোরেলের আগারগাঁও থেকে উত্তরা পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেশনের আশপাশের পিলার, শাহবাগের দেয়াল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের পাশ, নীলক্ষেত, ফার্মগেট কিংবা মিরপুরের কিছু অংশে এখনো রয়ে গেছে আন্দোলনের প্রতীকী চিত্র। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব গ্রাফিতির পাশ দিয়ে হেঁটে যান। কেউ কয়েক মুহূর্ত থেমে ছবি দেখেন, কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করেন, আবার কেউ দেয়ালে লেখা ছোট ছোট বার্তা পড়ে নেন। ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যেও এসব চিত্র মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় দুই বছর আগের উত্তাল দিনগুলোতে।

761496757_1080522471577844_4434558764126322048_n

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী সব গ্রাফিতি আগের অবস্থায় নেই। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অনেক দেয়ালচিত্র দলীয় পোস্টার, ব্যানার ও বিভিন্ন প্রচারসামগ্রী দিয়ে আংশিক বা পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও নতুন রঙের প্রলেপে মুছে গেছে আঁকা ছবি, আবার কোথাও নির্মাণ ও সংস্কারকাজের কারণে হারিয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রাফিতি। তবু মেট্রোরেলের অনেক পিলার, বিভিন্ন সড়কের দেয়াল এবং জনসমাগমস্থলের অসংখ্য দেয়ালচিত্র এখনো টিকে আছে। সেগুলো নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয় জুলাই অভ্যুত্থানের নিপীড়ন, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের কথা।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজপথই ছিল মানুষের সাহস, ভয়, ক্ষোভ ও স্বপ্নের মিলনস্থল। সেই সময়ের নানা অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে শিল্পীদের হাতে রঙ ও তুলির ভাষা পেয়েছে। দেয়ালের প্রতিটি রেখা যেন একটি ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করছে। কোথাও রক্তমাখা মুখ, কোথাও অশ্রুসিক্ত চোখ, কোথাও কাঁটাতারের আড়ালে বন্দি একটি মুখ, আবার কোথাও ভাঙা শিকল ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি। এসব চিত্রে বাস্তব ঘটনার সরাসরি বর্ণনা নেই, কিন্তু প্রতীকী উপস্থাপনায় আন্দোলনের আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গ্রাফিতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা। এখানে দীর্ঘ বক্তব্য নেই, নেই রাজনৈতিক বক্তৃতা। কয়েকটি রেখা, কয়েকটি রঙ আর সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দেই প্রকাশ পেয়েছে গভীর অনুভূতি। কোথাও লেখা আছে ‘ভয়কে জয় করো’, কোথাও ‘স্বাধীন কণ্ঠ রুদ্ধ করা যায় না’, কোথাও আবার শুধু একটি চোখের ছবি। এই সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী উপস্থাপনাই গ্রাফিতিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

763924614_1233114328907292_2601218591025233592_n

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, অনেক গ্রাফিতিতে মানুষের মুখের চেয়ে চোখকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিল্পীদের মতে, চোখই মানুষের অনুভূতির সবচেয়ে বড় ভাষা। তাই আতঙ্ক, প্রতিবাদ, ক্ষোভ কিংবা আশার প্রতীক হিসেবে চোখের ব্যবহার বেশি। একটি দেয়ালে দেখা যায়, একজন তরুণের চোখে অশ্রু, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। আরেকটিতে দেখা যায়, অসংখ্য মানুষের চোখ একই দিকে তাকিয়ে আছে। যেন তারা একটি পরিবর্তনের অপেক্ষায়।

রাজধানীর অনেক স্থানে এখনো দেখা যায় আন্দোলনের সময়ের স্লোগাননির্ভর দেয়ালচিত্র। যদিও সময়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় নতুন রঙের প্রলেপ পড়েছে, কোথাও বিজ্ঞাপনের পোস্টার লাগানো হয়েছে, কোথাও নির্মাণকাজের কারণে দেয়ালের অংশ ভেঙে গেছে।

পথচারীরা জানান, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলের সময় মেট্রোরেলের পিলার ও দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলো সহজেই তাদের নজর কাড়ে। ব্যস্ততার মধ্যেও অনেকেই কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছবিগুলো দেখেন, লেখাগুলো পড়েন এবং মোবাইল ফোনে ধারণ করেন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক গ্রাফিতি দলীয় পোস্টার, ব্যানার কিংবা নতুন রঙের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে, যা ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় বলেও মনে করেন তারা।

763374083_1380039164265353_4729276340609431481_n

বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রাকিব হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে মেট্রোরেলের পিলার আর বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলো দেখি। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ছবিগুলো এখনো সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে খেয়াল করেছি, কিছু জায়গায় দলীয় পোস্টার আর নতুন রঙের কারণে অনেক গ্রাফিতি ঢেকে গেছে। আমার মনে হয়, এগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের অনেক ঘটনা আমরা সরাসরি দেখেছি, আবার অনেক কিছু পরে জেনেছি। কিন্তু গ্রাফিতিগুলো দেখলে মনে হয়, সেই সময়ের ভয়, সাহস আর মানুষের আবেগ এখনো দেয়ালে জীবন্ত হয়ে আছে। নতুন প্রজন্মের জন্য এসব দেয়ালচিত্র সংরক্ষণ করা জরুরি।’

কলেজশিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গ্রাফিতির ছবি দেখেছি। তাই বন্ধুদের নিয়ে সামনে থেকে দেখতে এসেছি। বাস্তবে দেখে মনে হয়েছে, ছবিগুলো অনেক বেশি জীবন্ত। বিশেষ করে মেট্রোরেলের পিলারে আঁকা গ্রাফিতিগুলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ইতিহাস নিজের চোখে দেখতে পারে।’

এদিকে শনিবার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা জুলাই গ্রাফিতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে রং করা ও পুনর্লিখন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, গ্রাফিতির মূল বৈশিষ্ট্য, চেতনা ও তাৎপর্য অক্ষুণ্ন রেখে ১, ২ ও ৩ আগস্ট উপাচার্য ভবন থেকে রোকেয়া হল পর্যন্ত রং করা ও পুনর্লিখনের কাজ চলবে। এতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলো ফ্যাসিস্ট সরকারের দুঃশাসনের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। জনমনে সেই সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের স্মৃতি জাগিয়ে রাখতেই এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাই-আগস্টে দেশপ্রেমিক ছাত্র-ছাত্রীরা দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতির মাধ্যমে শেখ হাসিনার জুলুম, নির্যাতন ও আক্রোশের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এসব গ্রাফিতি এখন দেশের জীবন্ত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।’

চারুকলা, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করেন, গ্রাফিতি কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য আঁকা হয়নি। এগুলো একটি সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার শিল্পিত প্রকাশ। একটি দেয়ালচিত্র অনেক সময় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধের চেয়েও শক্তিশালী বার্তা বহন করতে পারে। কারণ ছবি ভাষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মানুষের অনুভূতিকে সরাসরি স্পর্শ করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণ আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে গ্রাফিতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ইউরোপের কয়েকটি শহর কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আন্দোলনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে দেয়ালচিত্র আজ ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতিগুলো ভবিষ্যতে একই ধরনের ঐতিহাসিক দলিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

763980319_1039382555746699_3561894942274212154_n

সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, একটি সমাজ যখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন শিল্পে দেখা যায়। কবিতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্রের পাশাপাশি গ্রাফিতিও সেই ধারার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ এটি সরাসরি জনপরিসরে অবস্থান করে এবং প্রতিদিন হাজারো মানুষের চোখে পড়ে। ফলে এর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে বেশি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা জানান, আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদবিরোধী চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীসহ সারা দেশে গ্রাফিতি অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। তরুণ শিক্ষার্থীরা কাঁচা হাতের লেখা, আঁকিবুঁকি ও দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অনুভূতি, ক্ষোভ, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রকাশ ঘটিয়েছিল। এসব গ্রাফিতি শুধু বক্তব্যের বাহন ছিল না, এর একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক দিকও ছিল।

তিনি বলেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের গ্রাফিতি মুছে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বহু আত্মত্যাগ, রক্তস্রোত এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যে চেতনা, সেই চেতনা যেন কখনো মুছে না যায়। গ্রাফিতিগুলো সেই সময়ের মানুষের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিরোধের ভাষা বহন করে। তাই দেয়ালের রং মুছে গেলেও এগুলোর অন্তর্নিহিত বার্তা ও ইতিহাস জাতির স্মৃতি থেকে কখনো মুছে যাওয়া উচিত নয়।

এএইচ/এমআই