জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল শুরুর আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও যাত্রী চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই রুটের ট্রেনের টিকেট এখন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। ফলে জনপ্রিয় এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে কাজ চলছে। কিন্তু ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ রুট বাড়িয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই ‘মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১/৭২২)’ কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল করবে। ফলে ঢাকা থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার যেতে তৃতীয় ও চট্রগ্রাম থেকে পঞ্চম ট্রেনের সুবিধা পাবেন। যারফলে কক্সবাজার পৌঁছাতে প্রতিদিন আসন নিয়ে প্রায় দেড় হাজার বাড়তি যাত্রীর যাতায়াত করতে পারবেন।
সম্প্রতি রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, চলতি আগস্ট মাসেই ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আরও একজোড়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে। তবে ‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ রুট বাড়িয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেননি তিনি।
গত শনিবার (১ আগস্ট) সকালে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রতিনিয়ত যাত্রী ও পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। তাই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং যাত্রীসেবা আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন ট্রেন চালু হলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে। টিকিটের চাপও অনেকটা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ভ্রমণ আরও সহজ, আরামদায়ক ও সময়োপযোগী হবে।’
পরে তিনি ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ কক্সবাজার পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই মাসের মধ্যে কার্যকর হয়ে যাবে। বলতে পারেন, এই মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে। আমরা চাচ্ছি রেলের কানেক্টিভিটি বাড়াতে। আমাদের লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও পর্যটন স্পট হিসেবে কক্সবাজারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ রুট কক্সবাজার পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও। তিনি বলেন, ‘আমরা এই মাসের মধ্যে (মহানগর এক্সপ্রেস) চালু করবো। বিষয়টি নিয়ে আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসতে হবে। আনুমানিক সময়টা এখনই বলতে পারছি না।’
রেলওয়ে সূত্র বলছে, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ট্রেনের টিকেটের ব্যাপক চাহিদার বিবেচনায় ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ সংকট থাকায় আপাতত নতুন ট্রেন চালুর সুযোগ নেই। এ কারণেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেনগুলোর সময়সূচি পর্যালোচনা করে ‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
চট্রগ্রাম-কক্সবাজার নতুন রেলপথ নির্মাণের পর ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস (৮১৩ ও ৮১৪)’ নামের একটি ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে ঢাকা-কক্সবাজারের সরাসরি যোগাযোগ শুরু হয়। পরে এই রুটে আরেকটি আন্তনগর ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস (৮১৫ ও ৮১৬) চালু হয়। এছাড়াও চট্রগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত দুটি লোকাল ট্রেনও চালু হয়।
কিন্তু এরপরও এই রুটে বিপুল যাত্রীচাহিদা রয়েছে। যারপ্রেক্ষিতেই ‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ রুট বাড়িয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনটি ৩২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। আর নতুন করে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গেলে আরও ১৫২ কিলোমিটার পথ যুক্ত হবে। ফলে ‘মহানগর এক্সপ্রেসের’ মোট দূরত্ব দাঁড়াচ্ছে ৪৭২ কিলোমিটার।
৪০ বছর ধরে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলাচল করছে মহানগর এক্সপ্রেস (৭২২)। সূচি অনুযায়ী, বর্তমানে ট্রেনটি ঢাকা থেকে রাত ৯টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং ভোর সাড়ে ৩টায় চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায়। আবার বেলা সাড়ে ১২টায় চট্রগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে মহানগর এক্সপ্রেস (৭২১) সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় এসে পৌঁছায়। ট্রেনটির মোট আসনসংখ্যা রাতে ৭০৬টি এবং দিনে ৭৩৬টি। ট্রেনটিতে এসি বার্থ (শুধু রাতে), স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) এবং শোভন চেয়ার শ্রেণির আসন রয়েছে। ফলে এই ট্রেনে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী আসন নিয়ে যাতায়াত করতে পারছেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রস্তাব অনুযায়ী ট্রেনটি কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু হলে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে চট্রগ্রাম থেকে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। এরপর টানা তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে পৌঁছাবে। আবার সেখানে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিরতির পর সকাল ৯টা ১০ মিনিটে কক্সবাজার স্টেশন থেকে ছেড়ে আসবে। তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে। এবং সেখানে ইঞ্জিন ঘুরানোর জন্য ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে আগের মতোই দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা আশা করছেন, মহানগর এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে ছেড়ে গিয়ে যে সময় চট্টগ্রাম পৌঁছায় তা ওই এলাকার মানুষের জন্য উপযুক্ত সময় নয়। যারফলে ট্রেনটিতে চট্টগ্রামের সরাসরি যাত্রী তুলনামূলক কম হয় এবং অধিকাংশই লোকাল যাত্রী যাতায়াত করেন। এখন ট্রেনটির রুট বাড়লে কক্সবাজারের যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত সময় হবে। ফলে ট্রেনটির সরাসরি যাত্রীর সংখ্যাও বাড়বে।
এএম/