নিজস্ব প্রতিবেদক
০২ আগস্ট ২০২৬, ১১:০২ পিএম
দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহনশীলতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, পরমতসহিষ্ণুতা, নৈতিকতা ও ন্যায্যতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসব মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য, দুর্নীতি ও অস্থিরতা দূর করা সম্ভব হবে না।
রোববার (২ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি আয়োজিত ‘শান্তির জন্য দর্শন’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও অর্থনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে নেতৃত্ব দেন।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, নৈতিকতা ও সহনশীলতার চর্চা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের মাধ্যমে সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফল হিসেবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কারণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমাশীলতা, সংলাপ ও ন্যায়ভিত্তিক পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একটি মানবিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা।
ইউজিসি চেয়ারম্যান জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে কমিশন অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে সফট স্কিল, নৈতিকতা ও মূল্যবোধবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ মডিউল প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়নকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উন্নয়নের ভিত্তি হতে হবে নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। মূল্যবোধহীন উন্নয়ন বৈষম্য ও অস্থিরতা বাড়ায়, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। তাই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল নাগরিক, নৈতিক নেতৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি এবং বিশ্বমানব হিসেবে গড়ে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
তিনি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমালোচনামূলক চিন্তাচর্চা, নৈতিক শিক্ষা, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং যুক্তিনির্ভর সংলাপের সংস্কৃতি আরও জোরদারে দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহ কাওসার মুস্তাফা আবুলওলায়ী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. সন্তোষ কুমার পাল, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এবং বাংলাদেশ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শাহজাহান মিয়া।
দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও দর্শনচিন্তাবিদরা অংশ নেন। সম্মেলনে শান্তি, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, দর্শনচর্চা এবং সমকালীন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দর্শনের ভূমিকা নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।
এএইচ/এমআর