Dhaka Mail Logo

জাতীয়

চাকরির বাজারে এখনো কাটেনি মহামারির ধকল!

আব্দুল হাকিম

৩০ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫ এএম

** এক পদের বিপরীতে আবেদন ২৮৭
** চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমে ৭০.২ শতাংশ
** আবেদন কমেছে মাত্র ৫৯.১ শতাংশ
** মহামারির আগেও প্রতি পদের বিপরীতে আবেদন ছিল ১৭৩টি
** ১৮ মাসে প্রকাশিত হয়েছে ৯৪ হাজার ৯১টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি
** প্রতিবছর ৭-৮ লাখ স্নাতকের বিপরীতে অফিস চাকরি মাত্র ১ লাখ
** বছরে প্রায় ৬ লাখ তরুণ কাঙ্ক্ষিত চাকরি থেকে বঞ্চিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার চর নারায়নপুর এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম ২০২০ সালের আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতেন। করোনা মহামারির সময় প্রতিষ্ঠানটি জনবল কমিয়ে দিলে চাকরি হারান তিনি। 

এরপর থেকে নিয়মিত চাকরির জন্য আবেদন করছেন। ভেবেছিলেন শুরুতে কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন চাকরি পেয়ে যাবেন। কিন্তু ছয় বছর পার হয়ে গেলেও স্থায়ী কিছু জোটেনি। অনেক সময় তাকে একটি পদের জন্য পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি কয়েক’শ প্রার্থী। এখন চাকরি খোঁজাটাই যেন তার একটা পূর্ণকালীন কাজ হয়ে গেছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার ২০২২ সালে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করেছেন। দুই বছরে শতাধিক চাকরিতে আবেদন করেছেন। 

তিনি বলেন, প্রতিদিন চাকরির ওয়েবসাইটে ঢুকি। নতুন বিজ্ঞপ্তি দেখলেই আবেদন করি। অনেক জায়গায় কোনো উত্তরই আসে না। আবার কোথাও সাক্ষাৎকার দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হতে পারি না। পরিবারের সবাই জানতে চায় চাকরির কী খবর। তখন উত্তর দিতে কষ্ট হয়।

রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আরিফ হোসেন। তিন বছর আগে মাস্টার্স ডিগ্রী শেষ করেন। একটা চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গাতে ইন্টারভিউ দিয়েছেন কিন্তু কোথাও মেলেনি চাকরি। এখনো আশাই আছেন সোনার হরিণ খ্যাত এই চাকরির। 

তিনি বলেন, একটা চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। নতুনদের জন্য সুযোগ খুবই সীমিত। অভিজ্ঞতা চাই, কিন্তু চাকরি না পেলে অভিজ্ঞতা হবে কীভাবে? এই চক্র থেকে বের হওয়াই সবচেয়ে কঠিন।

আরও পড়ুন:>>

৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার নতুন বাজেট দিচ্ছে ডিএসসিসি
মৃত্যু ফাঁদে টিসিবির লাইন: ক্ষুধা কেড়ে নিল জীবন

আমিনুল, তাসলিমা কিংবা আরিফের অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কায় আনুষ্ঠানিক খাতের চাকরির বাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মহামারির প্রথম লকডাউনে একটি চাকরির পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন আবেদন করেছিলেন।

করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম লকডাউনের ছয় বছর পরও দেশের আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। লকডাউনের সময় চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়। এমনকি মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পরও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা মহামারি-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। 

গবেষণায় ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৪৭ সপ্তাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন চাকরির পোর্টালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, খালি পদ, চাকরির আবেদন এবং প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণা বলছে, মহামারির আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতি একটি চাকরির পদের বিপরীতে গড়ে ১৭৩ দশমিক ২টি আবেদন জমা পড়ত। অর্থাৎ তখনও আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা ছিল বেশ তীব্র। তবে ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম লকডাউনের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

এ সময় চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ৭০ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে খালি পদের সংখ্যা কমে ৭৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীর আবেদন কমে মাত্র ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে প্রতি একটি পদের বিপরীতে আবেদন বেড়ে দাঁড়ায় ২৮৭ দশমিক ৩ জনে, যা পুরো গবেষণা সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

গবেষণায় বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে অন্যান্য দেশের তুলনাও করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে খালি পদ কমার হার ছিল ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের তুলনায় বেশি বা সমপর্যায়ের।

শুধু তা-ই নয়, লকডাউনের প্রভাবও ছিল দীর্ঘস্থায়ী। প্রথম সপ্তাহেই চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। তিন মাস পর এই চাপ সর্বোচ্চ ২৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। প্রায় নয় মাস পর্যন্ত প্রতিযোগিতা উচ্চ পর্যায়ে থাকে এবং লকডাউনের নির্দিষ্ট ধাক্কা কাটিয়ে বাজার স্বাভাবিক প্রবণতায় ফিরতে সময় লাগে প্রায় ৪১ সপ্তাহ।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তও চাকরির বাজার পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফেরেনি। এ সময় প্রতি পদের বিপরীতে আবেদন মহামারি-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এখনও আগের তুলনায় বেশি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো রেট বা নীতিসুদের পরিবর্তনের প্রভাব চাকরির বাজারে খুব সীমিত বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রেপো রেটের পরিবর্তন চাকরির বিজ্ঞপ্তির মাত্র ৬ শতাংশ পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে। অর্থাৎ আকস্মিক বড় ধরনের সংকটের তুলনায় ধীরগতির মুদ্রানীতির প্রভাব অনলাইন চাকরির বাজারে তুলনামূলকভাবে কম।

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য প্রকাশে কয়েক মাস সময় লাগে। ফলে চাকরির বাজারে আকস্মিক সংকট দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিন্তু অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য ব্যবহার করলে কয়েক দিনের মধ্যেই চাকরির বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। 

তাই সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এ ধরনের তথ্যকে সম্পূরক সূচক হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার এবং ভবিষ্যতের বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নিয়োগ প্রায় বন্ধ করে দিলেও চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে কমেনি। ফলে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং চাকরি পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষক অধ্যাপক আতনু রব্বানী বলেন, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা মহামারির আগেও অনেক বেশি ছিল। তবে করোনার লকডাউনে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিয়োগ বন্ধ করে দিলেও চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা একই হারে কমেনি। ফলে প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায় এবং শ্রমবাজারে নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি হয়। 

লকডাউনের ধাক্কা কাটিয়ে চাকরির বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে প্রায় ৪১ সপ্তাহ লেগেছে। এমনকি ২০২২ থেকে ২০২৫ সালেও শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা মহামারি-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অনলাইন জব পোর্টালের তথ্য শ্রমবাজারে আকস্মিক পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত দিতে পারে। তাই প্রচলিত শ্রমশক্তি জরিপের পাশাপাশি এ ধরনের তথ্য নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে চাকরি হারানো আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অনলাইন ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনা ও চাকরির প্ল্যাটফর্‌ম বিডিজবসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে দেশের বিভিন্ন খাতে মোট ৯৪ হাজার ৯১টি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এ সময়ে ১৭ হাজার ৯২৪টি প্রতিষ্ঠান জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

টেলিকম অ্যান্ড আইসিটি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিআইপিএপি) আহ্বায়ক এবং বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, দাপ্তরিক বা অফিসভিত্তিক চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হলেও মাঠপর্যায়ের কাজ ও শিল্পকারখানায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। 

প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য অফিসভিত্তিক চাকরির সুযোগ রয়েছে মাত্র ১ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার। ফলে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ তরুণ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, তরুণদের বড় একটি অংশ মাঠপর্যায়ের কাজ বা শিল্পকারখানায় কায়িক শ্রমনির্ভর পেশায় আগ্রহী নন। এ কারণে একদিকে অফিসের চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদনমুখী খাতগুলো প্রয়োজনীয় জনবল পাচ্ছে না। 

দেশে ও বিদেশে দক্ষ রাঁধুনি এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশাজীবীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের অনেক মানসম্মত রেস্তোরাঁও দক্ষ রাঁধুনির অভাবে ভুগছে। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই এসব পেশায় যুক্ত হতে চান না। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এসব কারিগরি পেশায় আয়ের সুযোগ সাধারণ দাপ্তরিক চাকরির চেয়েও বেশি।

তিনি আরও বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো কর্মমুখী ও হাতে-কলমে দক্ষতা উন্নয়নের শিক্ষা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সনদ অর্জন করলেও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এএইচ/এআরএম