Dhaka Mail Logo

জাতীয়

নিবন্ধন নিতে হবে খাবারের ছোট দোকানকেও, যেভাবে হবে কার্যকর

ঢাকা মেইল ডেস্ক

২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪১ এএম

দেশজুড়ে রাস্তা, ফুটপাত ও অলিগলিতে গড়ে ওঠা ছোট খাবারের দোকানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে নতুন বিধিমালা জারি করা হয়েছে।

নতুন বিধি অনুযায়ী, রাস্তা ও ফুটপাতে থাকা খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ, খাদ্য আমদানিকারক, উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—সবাইকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আওতায় আসতে হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী খাবারের দোকানকে বাস্তবে কীভাবে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী লতিফুল বারী বলেন, টং দোকান হিসেবে পরিচিত এসব খাবারের দোকানে ব্যবহৃত কাঁচামাল, রান্নার পদ্ধতি ও খাদ্যের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিধিমালা হওয়ার ফলে অন্তত এসব দোকান একটি কাঠামোর মধ্যে এল। তবে সরকারের এখনো এমন সক্ষমতা তৈরি হয়নি, যাতে সব দোকানের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়মিত যাচাই করা যায়।’

অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, নতুন বিধিমালা ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।

তিনি বলেন, ‘এক দিনে সব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোও লাইসেন্সিং ও তদারকির আওতায় আনা হবে।’

তবে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসানের দাবি, প্রবিধানটি একতরফাভাবে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এতে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চেইন। কোন ধাপে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেটিরও পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই।’

স্ট্রিট ফুডে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডে উদ্বেগজনক মাত্রায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ছোলামুড়ি, চটপটি, আখের রস, শরবত, মিশ্র সালাদ ও স্যান্ডউইচে ডায়রিয়ার জন্য দায়ী। কারণ এতে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫০টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৪৫০টি নমুনার প্রতিটিতেই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর মধ্যে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানের পাশাপাশি প্রায় ৬৭ হাজার ফাস্ট ফুডের দোকান রয়েছে।

কী বলা হয়েছে নতুন বিধিমালায় 

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩–এর আওতায় প্রণীত নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) বিধি, ২০২৬ গত ১৬ জুলাই সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়।

বিধিমালায় বলা হয়, খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।

ছোট ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে। আর বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স নিতে হবে।

নিবন্ধনের মেয়াদ হবে তিন বছর। পরে তা নবায়ন করা যাবে।

এ ছাড়া উৎপাদন বা আমদানির জন্য লাইসেন্স নেওয়ার পর কোনো খাদ্যপণ্য নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ও প্যাকেজিংয়ে বাজারজাত করতে চাইলে সেই ব্র্যান্ড ও প্যাকেজিংয়ের জন্যও পৃথক নিবন্ধন নিতে হবে।

বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব

ঢাকার বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকা, অফিসপাড়া ও ব্যস্ত সড়কের পাশে অসংখ্য ভাসমান খাবারের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে সিঙ্গারা, চপ, স্যান্ডউইচ, ছোলা, খিচুড়ি ও ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার বিক্রি হয়। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীদের বড় একটি অংশ এসব দোকানের ওপর নির্ভরশীল।

গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কের একটি খাবারের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল আলম তালুকদার।

তিনি বলেন, ‘স্ট্রিট ফুড আমার ভালো লাগে। ছাত্রজীবনেও খেতাম। এখনো অফিসের পাশের দোকান থেকে নাশতা করি। কিছু পণ্যের মেয়াদ দেখি। তবে অনেক সময় মান ভালো না জেনেও খাই।’

এ অবস্থায় নিবন্ধন না থাকলে এসব দোকানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

রমনা এলাকার ছোট দোকানি লিটন শেখ বলেন, সরকার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে—এমন কোনো তথ্য তিনি এখনো জানেন না।

একই এলাকার ভাসমান দোকানি আবদুর রহিমও বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।

আরেক ব্যবসায়ীর মতে, দেশে এত বিপুলসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান রয়েছে যে সেগুলো তদারকির মতো জনবল ও পরীক্ষাগার-সুবিধা এখনো সরকারের নেই।

তিনি বলেন, ‘বিধিমালাটি যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবে কীভাবে এটি কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, শুরুতে বিএসটিআইয়ের সনদধারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। তবে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের মান যাচাইয়ে বন্দরে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ চলছে।

ফুটপাত ও রাস্তার পাশের খাবারের দোকানগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। আবেদন প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব সহজ করা হবে, যাতে অনলাইনেই নিবন্ধন নেওয়া যায়।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, শুধু নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম খাদ্য ব্যবসার পুরো ব্যবস্থাপনা একটি কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকুক। কিন্তু এখন যা হয়েছে, তাতে লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়ার আশঙ্কাই বেশি।’ সূত্র: বিবিসি

এআরএম