মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
তীব্র গরমে যখন নগরজীবন হাঁসফাঁস তখন একটু বৃষ্টির আশায় ব্যাকুল হয়ে থাকে সবার মন। বৃষ্টির শীতলতার ছোঁয়ায় নেমে আসে প্রশান্তি। কিন্তু পরিমাণে একটু বেশি হলেই রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টি যেন এক আতঙ্কের নাম। একটু ভারী বৃষ্টিতে ভোগান্তির শেষ নেই রাজধানীবাসীর। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। তলিয়ে যায় অলিগলির পথঘাট। টানা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। তখন মহাসড়কগুলো যেন রূপ নেয় মহাসাগরে। প্রশান্তির বৃষ্টি চরম ভোগান্তি নিয়ে আসে এই শহরের মানুষের জন্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে একসময় অনেক খাল ও নালা ছিল। যেগুলে ধীরে ধীরে ভরাট বা দখল হয়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনায় শহরের ড্রেনগুলোর স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই দেখা দিচ্ছে জলবদ্ধতা।
গত শনিবার (১১ জুলাই) রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে ভয়ানক জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয় রাজধানীজুড়ে। হাঁটু পানিতে ডুবে যায় নগরে বেশির ভাগ সড়ক। কোনো কোনো সড়কে কোমর পানি পর্যন্ত আটকে থাকতে দেখা যায়। সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তির শেষ নেই। রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুরে, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডসহ নগরীর অনেক এলাকার দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
আরও পড়ুন
ঢাকার জলাবদ্ধতায় কার দায় কতটুকু?
রাজধানীতে জলাবদ্ধতা যেন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। এর জন্য যেমন নগর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা দায়ী, তেমনি নগরবাসীর অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। ধরুন, রাস্তায় বা ফুটপাতে হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা বা তৃষ্ণা পেল। ব্যাগ থেকে একটি চিপসের প্যাকেট কিংবা পানির বোতল বা কোমল পানীয় বের করে খাওয়ার পর অবহেলাভরে সেগুলো রাস্তায় ছুড়ে ফেললাম। একবারও ভাবলাম না, এই প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল বৃষ্টির পানির সঙ্গে ভেসে একসময় ড্রেনে গিয়ে জমবে। এভাবে অসংখ্য ছোট ছোট আবর্জনা জমে ড্রেনের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, যার দুর্ভোগ পোহাতে হয় হাজারো সাধারণ মানুষকে।
আমরা দৈনন্দিন যে প্লাস্টিক ব্যবহার করে থাকি একটা পর্যায়ে গিয়ে তার সর্বশেষ গন্তব্য হচ্ছে সাগর-মহাসাগরে। আর এ প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে বেশি প্রভাব সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর। প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এই প্লাস্টিক আমাদের যে কী পরিমাণ ক্ষতি করছে তা কল্পনাও করা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ব্যবহৃত এসব ছোট ছোট প্লাস্টিক জমা হয়ে সমুদ্রতলে বিশাল স্তর তৈরি হচ্ছে। শুধু একটি মহাসাগরেই বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তরের আয়তন প্রায় ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার। যা প্রায় ১০টা বাংলাদেশের সমান।
শুধু চিপস বা বিস্কুটের প্যাকেট বা পানির বোতলই নয়, প্রায় সময় বাসা বা ছাদের কোণে ফেলে রাখা হয় ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ার, অব্যবহৃত আসবাবপত্র। যেখানে বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি জমে বসবাস শুরু করে এডিস মশা। যে মশা ছড়িয়ে পড়ে পুরো মহল্লায়। ঘরে ঘরে শুরু হয় ডেঙ্গুসহ নানা মশাবাহিত রোগ। রাজধানীতে জলবদ্ধতা এডিস মশাসহ নানা কারণে আমরা শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দোষারোপ করে থাকি। অথচ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন ছোট ছোট ভুলগুলোই একসময় বড় আকার ধারণ করে মহাদুর্ভোগে পরিণত হচ্ছে। ময়লা আবর্জনা, প্লাস্টিকের বোতল বা পলেথিনের প্যাকেট নির্দিষ্ট স্থানে খুব কঠিন বা কোনো কষ্টকর কাজ নয়। আমাদের সামান্য অবহেলার কারণেই এমনটা হয়ে থাকে।
রাজধানীর মুগদা এলাকায় বাজার মসজিদের সামনের রাস্তায় প্রায় সময় পানি জমা হয়ে থাকে। সিটি করপোরেশনের ড্রেন সংস্কার কর্মীরা প্রায় সময় ড্রেন পরিষ্কার করে দিয়ে যান। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার একই অবস্থা দেখা যায়। গত দুই দিন আগে পরিচ্ছন্নকর্মীরা ড্রেন পরিষ্কার করলে সেখানে দেখা যায় ময়লা আবর্জনার অর্ধেকই প্লাস্টিক জাতীয় বস্তু। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের একজন বলেন, এসব প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, কাগজ জমা হয়েই ড্রেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে পানি যেতে না পেরে তা ম্যানহোল দিয়ে রাস্তায় চলে আসছে।
রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে একটু সামনের দিকে ফুটপাত বসেছে কাপড় জুতাসহ বিভিন্ন জিনিসের দোকান। সেই ফুটপাতের ধার ঘেঁষে অনেক জায়গায় ফেলা হয়েছে দোকানের আবর্জনা। যার বেশির ভাগই প্লাস্টিকের মতো অপচনশীল বস্তু। আবর্জনা স্তূপের পাশেই দেখে গেছে ড্রেনের ম্যানহোল। অনেক আবর্জনা গিয়ে পড়ছে ম্যানহোলে। এটা শুধু গুলিস্তান এলাকাই নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটা ফুটপাতেই এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
ফুটপাতে পার্কে যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলা নিয়ে অনেকজনের সঙ্গে কথা হয়। এ বিষয়ে কমলাপুর এলাকায় এক পথচারী বলেন, আমাদের পাবলিকেরও একটা দোষ আছে, যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলতে ফেলতে খারাপ অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু পাবলিক কী করবে বলেন! আবর্জনা ফেলার জন্য আশপাশে কোথাও ডাস্টবিন পাওয়া যায় না। কাজেই যেখানে সেখানে আবর্জনা ফেলতে হয়।
আমাদের ফেলে দেওয়া এসব প্লাস্টিক বর্জে্যর সর্বশেষ আশ্রস্থল হচ্ছে সমুদ্র। গবেষকরা বলছেন, এসব প্লাস্টিক ময়লা আবর্জনা শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেই নষ্ট করছে না, এসব প্লাস্টিক দূষণ আমাদের জীবনেও অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই) বিভাগের অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলামের গবেষণা থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩৮১ কোটি টন প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ হচ্ছে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ)। শুধু শতকরা ৯ ভাগ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ পৃথিবীতে প্লাস্টিকের দ্রব্য উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হবে।
শুধু সমুদ্রের তলদেশ নয়, সমুদ্রের পানির উপরিস্তরের প্রায় শতকরা ৮৮ ভাগ কম-বেশি প্লাস্টিকদূষণে দূষিত। প্লাস্টিক বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করছে প্লাস্টিক ব্যাগ বা পলিথিন ব্যাগ। প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক ব্যাগ আমরা ব্যবহারের পর ফেলে দিচ্ছি। সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর প্লাস্টিক ব্যাগ বর্জ্য ৫০ হাজার কোটি। প্রতি বছর ৮৩০ কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্লাস্টিকের টুকরা আমরা অসচেতনভাবে সমুদ্র সৈকতে ফেলে আসছি। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৫ সালে সমুদ্রে মাছের সংখ্যার চেয়ে প্লাস্টিকের দ্রব্য ও কণার সংখ্যা বেশি হবে।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল সাইন্স এজেন্সি সিএসআইআরও–এর এক জরিপে বলা হয়েছে, প্রতি বছর সমুদ্রের তলদেশের আনাচে কানাচে বিশাল পরিমান মাইক্রোপ্লাস্টিক জমছে যা দূষণ বৃদ্ধি ছাড়াও সৈকতে জঞ্জাল সৃষ্টি করছে এবং প্রাণিদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। প্লাস্টিকের দূষণ অ্যান্টার্কটিকার গভীরতম অঞ্চলেও পাওয়া গেছে। সমুদ্রের তলদেশে এধরনের প্লাস্টিকের স্তর সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুব কমই, সমীক্ষা বলছে, ভাসমান বা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ে ৩৫ গুণ বেশি রয়েছে সাগরের নিচে।
এদিকে অস্তিত্ব সংকটে রাজধানীর আশেপাশের প্রায় সব খাল। দখলে কোনোটি ছোট আবার কোনোটি অবহেলার কারণে পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, খাল উদ্ধারে তেমন তৎপরতা নেই সিটি করপোরেশনের। জানা গেছে, একসময় ঢাকা মহানগরীতে প্রধান ড্রেন লাইনগুলো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসার। শাখা লাইনগুলোর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত ছিল। সে সময় রাজধানীর মোট ড্রেনেজ লাইনের মধ্যে ৩৮৫ কিলোমিটার ঢাকা ওয়াসার অধীনে এবং প্রায় দুই হাজার ৫০০ কিলোমিটার ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীনে ছিল। এর বাইরে ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ২৬টি খাল ও ১০ কিলোমিটার বক্স-কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ছিল ঢাকা ওয়াসার। যে কারণে বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে সংস্থাগুলো একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে আসছিল। ওয়াসার দায়িত্বে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও খালের সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে দুই সিটি। তবে এখনো পুরোপুরি সুফল পাওয়া শুরু করেনি নগরবাসী।
আরও পড়ুন
রাজধানীর রাস্তায় অপেক্ষা নৌকা নামার!
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক, নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রতি বছরেই ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে বিভিন্ন খাল বিল ভরাট করা হচ্ছে। যার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদের যে লোকাল ড্রেনগুলো আছে, যেগুলো দিয়ে পানি খাল হয়ে নদীতে গিয়ে পড়বে, এগুলোর ব্যবস্থাপনার অবস্থা খুবই খারাপ। এই বর্ষা মৌসুমেও প্রচুর কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক হয়েছে। কিন্তু লোকাল ড্রেনগুলোতে সেই রেগুলার মেডিনেট কাজটা হয়নি। সব মিলে ঢাকার যে এই মুহূর্তের অবস্থা, এই পানিগুলো যে নামবে, সিটি করপোরেশনের সেই কাজের গতিও সীমিত হয়ে গেছে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আশির দশক থেকে খালগুলো হারাতে শুরু করে। যখন ঢাকা শহরে উঁচু এলাকাগুলোতে নগরায়ন শেষ হয়ে গেল তখন আশেপাশে যত নিম্নভূমি আছে সেগুলোতে নগরায়িত হওয়া শুরু করল অপরিকল্পিতভাবে। এরপর নিম্নভূমি, নিচু জলাশয় আর খালগুলো দখল হতে শুরু করল। এরপর সেগুলোও নগরায়ন হতে শুরু করল। একটা সময় ঢাকা শহরে নিচু এলাকা দিয়ে খালগুলো প্রবাহিত থাকত। আর যখন হাউজিংগুলো তৈরি হওয়া শুরু করল ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং হাউজিং কোম্পানির অধীনে, তখন ধীরে ধীরে খালগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করে। বলা যায়, গত চার দশকে এই পরিকল্পিত নগরায়নের কারণে খালগুলো হারিয়ে গেছে। যার কারণে এখন একটু বৃষ্টি হলেই বেহাল অবস্থা হচ্ছে ঢাকা শহরের।’
টিএই/জেবি