বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকার জলাবদ্ধতায় কার দায় কতটুকু?

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

শেয়ার করুন:

ঢাকার জলাবদ্ধতায় কার দায় কতটুকু?
ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন ঢাকার রাস্তাঘাট। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে রোববার (১২ জুলাই) সকাল থেকেই নামে মুষলধারে বৃষ্টি। এতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তলিয়ে যায় ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি। সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের এই বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। তবে এই দুর্ভোগ নগরবাসীর জন্য নতুন নয়। সামান্য বৃষ্টিতেই প্রতিনিয়তই ডুবে যাচ্ছে শহর। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর ধরে চলা এই জলাবদ্ধতার দায় আসলে কার?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার জন্য সিটি করপোরেশনের দায় যেমন আছে, তেমনি দায় রয়েছে রাজউক-ওয়াসাসহ অন্যান্য সরকারি সেবা সংস্থার। আবার খাল-নালা ও ড্রেনে পলিথিন ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য ফেলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় নগরবাসীর অসচেতনতাও জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী।

আরও পড়ুন

হাজার কোটি টাকা গিলে খাচ্ছে জলাবদ্ধতা!

নগরপরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা সমস্যার জন্য প্রধাননত দায়ী সিটি করপোরেশন, কারণ তারা দায়িত্ব থেকেও তা সামাল দিতে পারছে না। তবে অন্যান্য সরকারি সেবা সংস্থাগুলোও এর দায় এড়াতে পারেন না। নাগরিকদের দায়ও কোনো অংশে কম নয়। সবার সম্মিলিত দায়ের কারণেই এই জলাবদ্ধতা।’

Rain5

দায় বেশি সিটি করপোরেশনের

২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর খাল ও ড্রেনেজব্যবস্থার একক কর্তৃত্ব পায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। পরবর্তী সময়ে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গেলেও তাতে সুফল পায়নি নগরবাসী। বরং দিনদিন জলাবদ্ধতা সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।

আরও পড়ুন

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটির ‘মহাপরিকল্পনা’

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মিলিয়ে অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ডিএসসিসির ব্যয় করেছে প্রায় ৩৬০ কোটি। আর ডিএনসিসি খরচ করেছে ৩৭০ কোটি টাকা। এছাড়া নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণেই প্রতি বছর ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে ঢাকার দুই সিটি। অথচ, সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীর সড়ক থেকে অলিগলি সবত্র পানিতে থইথই করে।

Dhaka3

নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিসরনের নামে সিটি করপোরেশন বিভিন্নভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ কারণেই জলাবদ্ধতা না কমে আরও বেড়েছে। তবে দুই সিটি করপোরেশন বলছে, জলাবদ্ধতা নিসরনে এখন পরিকল্পিত প্রকল্প নিচ্ছে। এজন্য দুই সিটি একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) তৈরির কাজও শুরু করেছে।

রাজউকের দায় আরও বেশি

রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন। এই কারণেই জলাবদ্ধতার মাত্রা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ফলে জলাবদ্ধতার দায় কোনোভাবে এড়াতে পারে না তারা।

পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, গত তিন দশকে ঢাকার মোট আয়তনের ২০ শতাংশের বেশি এলাকায় জলাভূমি ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়নে জলাভূমি কমে ২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সময়ে ঢাকার মোট জলাভূমির প্রায় ৮৬ শতাংশ ভরাট করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

এবারের বর্ষায় কেন ভয়ংকর রূপ দেখছে চট্টগ্রাম?

বিআইপির গবেষণা অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়নে ফাঁকা জায়গা কমে আসা এবং কনক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণও ভয়াবহভাবে কমেছে। ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরের ফাঁকা জায়গা ছিল ৫২ বর্গকিলোমিটারের বেশি। এখন সেটি ৪৩ শতাংশ কমে ৩০ বর্গকিলোমিটারের এসে দাঁড়িয়েছে।

Dhaka4

বিআইপির গবেষণা বলছে, ঢাকায় ধূসর এলাকা ও কংক্রিটের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা ১৯৯৯ সালে ছিল ৬৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশে।

নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জলাভূমি রক্ষা ও পরিকল্পিত নগরায়নে রাজউকের ব্যর্থতায় ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়িয়েছে। তাই ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্যও তারাও দায়ী।

ওয়াসার ব্যর্থতাই জলাবদ্ধতার ভিত্তি

২০২১ সালের আগে দুই দশক ঢাকার খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিল ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু দায়িত্ব থেকেও রাজধানীর খালগুলো রক্ষা করতে পারিনি তারা। ওয়াসার সামনেই প্রায় সব খালই দখল ভরাট হয়েছে।

আরও পড়ুন

রাজধানীর রাস্তায় অপেক্ষা নৌকা নামার!

খালগুলো যেমন রক্ষনাবেক্ষণে যেমন ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ড্রেনেজ ব্যবস্থাও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেনি। পরে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ওয়াসা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জলাবদ্ধতা নিসরনের নামে দীর্ঘ দুই দশকে ওয়াসাও কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছিল। কিন্তু সেই টাকা জলে যায়।

Dhaka4

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা যে পরিস্থিতি দাড়াচ্ছে সেটির ভিত্তি গড়ে দিয়ে গিয়েছিল ওয়াসা। সংস্থাটির অপরিকল্পিত একের পর প্রকল্পের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। মূলত সেই কারণেই এখন জলাবদ্ধতা নিরসন জটিল আকার ধারণ করেছে।

দায় এড়াতে পারে না সড়ক ও সেতু বিভাগও

ঢাকায় বিভিন্ন ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। সংস্থাটি মেট্রোরেলও নির্মাণ করেছে। নতুন নতুন মেট্রোরেলের কাজও চলছে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর ভূমির ভারসাম্য হারাচ্ছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

ঢাকায় সবচেয়ে বড় ফ্লাইওয়ার নির্মিত হয়েছে মালিবাগ মগবাজারে। ওই এলাকায় এখন জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, মালিবাগ এলাকার ড্রেনেজ লাইনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এখন অকার্যকর।

এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে মালিবাগ রেল গেট এলাকার ড্রেনেজ সিস্টেম অকেজো হয়ে গিয়েছে বলে সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়। এ কারণে সাময়িক সময়ের জন্য বিকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে সিটি করপোরেশন বারবার এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলেও জানান একজন কর্মকর্তা। 

Dhaka7

মেট্রোরেল নির্মাণের কারণে নর্দা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর করছে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। ফলে এই সড়কের আশপাশ এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

বিটিসিএল-টিজিটিডি বা সেবা সংস্থাগুলোর দায়ও কম নয়

রাজধানী ঢাকায় গ্যাস বিতরণ করে আসছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন (টিজিটিডি)। টেলিযোগাযোগ,  ইন্টারনেট ও ডেটা কানেক্টিভিটির কাজ করে আসছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)।

এছাড়া ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেস্কো)। এসব রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থাও নিয়মিতই ঢাকার সড়ক ও অলিগলি খোড়াখুড়ির মধ্যে থাকছে। ফলে এলাকাগুলোর ড্রেনেজ লাইন অচল হয়ে পড়ছে। এতে বৃষ্টি হলেই পানি নিষ্কাশন হতে বাধা পাচ্ছে।

নগরপরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। ফলে যখন যার মন চাই রাস্তা কেটে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ড্রেনেজ লাইনের বেহল অবস্থা তৈরি হচ্ছে। তাই সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়তা আনা না গেলে জলাবদ্ধতা নিসরন চ্যালেঞ্জ হবে।

বড় দায় নাগরিকদের

রাজধানীর ড্রেনেজ লাইনগুলো পরিষ্কার করে কূল পায় না সিটি করপোরেশন। কারণ লাইনগুলোতে বাসিন্দাদের ফেলানো ময়লা আবর্জনায় ভরে যায়। পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক মাধ্যম খালগুলোও নাগরিকদের ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। দখল ভরাটও করা হয়। ফলে বৃষ্টির পানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

Dhaka9

জলাবদ্ধতার দায় দিতে গিয়ে নাগরিকদের বেশি দিচ্ছিন অনেকে। সিটি করপোরেশনও বলে আসছে, ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।

নগরপরিকল্পনাবিদরা অবশ্য বলছেন, নাগরিকদের সচেতন করতে না পাড়ার দায় সিটি করপোরেশনেরই। সিটি করপোরেশের উচিত, জনগণের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও সচেতনতা তৈরি করা। আর নয়ত জলাবদ্ধতার সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এএম/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর