মাহফুজ উল্লাহ হিমু
১০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে ছিলেন জাহিদুল ইসলাম। বুক আর হাতে গুলিবিদ্ধ জাহিদ তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এমন সময় রামপুরা গোলচত্বরে অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে ভেতরে উঁকি দেয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। তাদের একজন জাহিদকে চিনে বলে ওঠেন, ‘ও তো সকাল থেকে অনেক করছে... ওরে গুলি করে দে।’
কয়েক সেকেন্ডের সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারেন না জাহিদ। তার বিশ্বাস, সেদিন ভাগ্য সহায় ছিল বলেই তিনি বেঁচে ফিরেছেন। তবে প্রাণ বাঁচলেও আর বাঁচেনি তার ডান হাত। তার হাতের তিনটি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাত নড়াতে পারেন না, কিছু ধরতে পারেন না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে।
জুলাইয়ের সেই অগ্নি ঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে ঢাকা মেইলকে জুলাই যোদ্ধা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আগে আন্দোলনে ছিলাম না। ১৯ জুলাই ছুটির দিন ছিল বলে সকালে রামপুরা গোলচত্বরে গিয়েছিলাম। তখনও পরিস্থিতি শান্ত ছিল। কিন্তু সেদিনই আমরা বনশ্রী রোডে আন্দোলন শুরু করি।’
তার ভাষ্য, সকাল ১০টার দিকে কয়েকজন আন্দোলনকারী শুধু কলাগাছ ফেলে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করছিলেন। তখনই কোনো ধরনের বড় সংঘর্ষ ছাড়াই বিজিবি গুলি চালায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু কলাগাছ ফেলছিলাম। হঠাৎ তারা গুলি করল। আমার পায়ের মাঝখান দিয়ে গুলি চলে গিয়ে পিছনের এক ভাইয়ের পায়ে লাগে। ওইটা দেখার পর মানুষ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়।’
জাহিদ বলেন, সেদিন সকাল থেকে কয়েক দফা রামপুরা গোলচত্বরে ওঠার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু প্রতিবারই গুলির মুখে পিছিয়ে যেতে হয়।
‘আমাদের মনে হচ্ছিল, পাঁচ-সাতটা লাশ পড়লেও আমরা গোলচত্বরে উঠব। কিন্তু ওরা কোনো মায়া-দয়া করে নাই। সামনে গেলেই গুলি করত’, যোগ করেন এই জুলাই যোদ্ধা।
সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুই দিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি তার। শরীরে শক্তিও ছিল না। একপর্যায়ে একটি মসজিদে গিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে পড়েন। কিন্তু সেখানেও থামেনি গুলির শব্দ। বলেন, ‘শুয়ে আছি, হঠাৎ দেখি আমার পিছনে একজনকে গুলি করল। ভাবলাম, বিজিবি তো ওইদিকে, এইদিকে গুলি করল কে? সামনে তাকিয়ে দেখি পুলিশ। তখন আর নিজেরে ধরে রাখতে পারি নাই।’
>> আরও পড়ুন
‘যা’ বলার পর পেছন ফিরতেই গুলি করে পুলিশ
এরপর তিনিও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতিরোধে যোগ দেন। বনশ্রীর বিভিন্ন গলি ঘুরে পুলিশকে লক্ষ্য করে টাইলস ভেঙে তৈরি করা ছোট ছোট ইটের টুকরা ছুড়তে থাকেন।
জাহিদ বলেন, ‘আমি ঢিল অনেক দূর মারতে পারতাম। আশপাশের মানুষ টাইলস ভেঙে এনে দিত। আমি মারতাম, আবার গলিতে দৌড়ে যেতাম। আবার বের হয়ে মারতাম।’
বিকেলের দিকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে রামপুরা থানা ও মেরাদিয়া বাজার এলাকায়। ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের সামনে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন জাহিদ। তখনই জীবন বদলে যায়।
তিনি বলেন, ‘শরীরে আর শক্তি ছিল না। হঠাৎ গলির ভেতর থেকে একটা গুলি এসে হাতে লাগে। হাতটা একদিকে চলে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওপরের ভবন থেকে আরেকটা গুলি এসে বুকে লাগে।’
গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকলেও দীর্ঘ সময় কেউ তাকে সরিয়ে নিতে পারেনি। নিজের দুঃসহ স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি অনেকক্ষণ পড়ে ছিলাম। আশপাশে লাশও ছিল। কেউ ধরতে পারছিল না। তখন শুনলাম, বিজিবির গাড়ি আসতেছে। সবাই বলল, এখন যদি না তুলি, তাহলে যারা বেঁচে আছে, তাদেরও মেরে ফেলবে।’
এরপর কয়েকজন আন্দোলনকারী ও হাসপাতালের কর্মীরা তাকে টেনে ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান।
ভেতরের দৃশ্য ছিল আরও ভয়াবহ। জাহিদের ভাষ্য, ‘ছোট্ট একটা ক্লিনিক। কিন্তু অন্তত ৫০ জন আহত মানুষ। কারো মাথায় গুলি, কারো হাতে, কারো তলপেটে। আর যারা মারা গেছে, তাদের অনেককে রাস্তাতেই ফেলে রাখা হয়েছিল।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত কয়েকজন গুরুতর আহতকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বিজিবির উপস্থিতিতে কেউ অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে সাহস পাচ্ছিল না।
জাহিদ বলেন, “সিয়াম নামে একটা ছেলে; ও বলল, ‘আমার জীবন যাক, আমি নিয়ে যাই।’ তারপর পাঁচজনকে একটা অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়।”
কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর আগেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে মারা যান দুজন আহত। ‘আমরা পাঁচজন ছিলাম। রামপুরা গোলচত্বর উঠতেই দুইজন মারা গেল। আমার অবস্থাও খুব খারাপ। তখনও রক্ত পড়ছিল’, যোগ করেন তিনি।
এরপরই আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত, যা এখনও দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফেরে তাকে। জাহিদ বলেন, “গোলচত্বরে বিজিবির গাড়ি অ্যাম্বুলেন্স থামাল। একজন ভেতরে তাকিয়ে বলল, ‘ও তো সকাল থেকে অনেক করছে... এমনি মরে গেছে, ওরে গুলি করে দে।’ তারপর আমাদের সঙ্গে থাকা ছেলেটাকে নামিয়ে মারধর করল। পরে দেখে দুইজন তো আগেই মারা গেছে। তখন আর কিছু না বলে চলে যায়।”
মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখে সেদিন ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছান জাহিদ। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল আরেক যুদ্ধ; চিকিৎসা পাওয়ার যুদ্ধ।

জুলাইয়ের যুদ্ধ শেষ হলেও, শেষ হয়নি জাহিদের জীবন যুদ্ধ
ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর পরও শেষ হয়নি জাহিদুল ইসলামের যুদ্ধ। বরং শুরু হয় আরেক লড়াই, চিকিৎসা পাওয়ার লড়াই।
তার ভাষ্য, হাসপাতালে আহত মানুষের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে চিকিৎসকেরা সবাইকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। রক্তের সংকট ছিল তীব্র। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডজুড়ে ছিল আর্তনাদ, রক্তাক্ত মানুষ আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা।
জাহিদ বলেন, ‘আমি তখন ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলাম না। শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু উত্তর দেওয়ার শক্তি ছিল না। আমাকে বেডও দেয়নি। বেডের পাশে শুইয়ে রাখছিল। পাশে একজন রক্তবমি করছিল, সেই রক্ত আমার মাথায় পড়তেছিল। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, কারও মাথায় গুলি, কারও বুকে, কারও হাতে। মনে হচ্ছিল পুরো হাসপাতালটাই যুদ্ধক্ষেত্র।’
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে হাসপাতালের বাইরে। আহতদের জন্য রক্ত দিতে আসা মানুষদেরও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা রক্ত দিতে আসছিল। কিন্তু পুলিশ গেটে দাঁড়িয়ে অনেককে ঢুকতে দেয়নি। পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া করতে করতে পুলিশ ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড পর্যন্ত ঢুকে যায়।’
হাতের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকেরা দ্রুত তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠান। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি মেলেনি।
জাহিদ বলেন, ‘ডাক্তার বলল, আমার হাতে দ্রুত ভাস্কুলার সার্জারি লাগবে। পরে পরীক্ষা করে বলে, এত বড় হাড়ই নাই, শুধু রক্তনালী জোড়া লাগিয়ে লাভ হবে না। তখন আবার নিটোরে পাঠিয়ে দিলো।’
২০ জুলাই ভোরে নিটোরের অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় তাকে। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসকদের আচরণে ভিন্নতা দেখেছেন জাহিদ।
তিনি বলেন, “একজন ডাক্তার আইসা গালাগালি করতেছে, ‘তোরে দেখলেই মনে হয় তুই আন্দোলন করছস।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আন্দোলন করি নাই, দেখতে গেছিলাম।’ উনি বললেন, ‘না, তোরে দেখলেই মনে হয় তুই আন্দোলনকারী।’ আবার আরেকজন ডাক্তার আইসা বলতেছে, ‘আহা! তোমাদের জন্য খুব আফসোস হয়।’ একই হাসপাতালে দুই রকম আচরণ দেখছি।”
নিটোর থেকে আবার হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে ভাস্কুলার সার্জারি করা হয়। কিন্তু এরপরও হাসপাতালে থাকার সাহস পাননি তিনি।
জাহিদ বলেন, ‘চারদিকে এমন ভয় ছিল, কেউ বলত, হাসপাতালে গেলে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলবে। কেউ বলত, জবাই করে ফেলবে। তখন আর হাসপাতালে থাকার সাহস পাইনি। সোজা বোনের বাসায় চলে যাই।’
এরপর দীর্ঘদিন গোপনেই চলে তার চিকিৎসা।
দারুসসালামে বোনের বাসায় অবস্থানকালে ইবনে সিনা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নিয়মিত গিয়ে তার ক্ষত দেখতেন। কোনো ভিজিট নিতেন না। তবে প্রতিদিন ড্রেসিং করাতে খরচ হতো দেড় হাজার টাকা।
জাহিদ বলেন, ‘ডাক্তার কোনো ফি নিত না। কিন্তু প্রতিদিন ড্রেসিং করতে হতো। ড্রেসিংয়ের সময় মনে হতো মৃত্যুযন্ত্রণা। অপারেশনের খরচ, ওষুধ, সব নিজের টাকায় চালাতে হয়েছে।’
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর শুনে হাসপাতালের বেডে শুয়েও অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল তার।
তিনি বলেন, ‘হাত ঝুলে আছে, কিন্তু মনে হচ্ছিল কোনো ব্যথাই নাই। বারান্দায় দাঁড়াইছিলাম। মানুষ শুধু আমাকে একবার দেখবে বলে ভিড় করছিল। কিন্তু নিচে নেমে দেখি কেউ চেয়ার নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ টেবিল, কেউ অন্য জিনিসপত্র। তখন খুব খারাপ লাগছিল। আমরা কি এটার জন্য হাত দিলাম?’
কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরও শেষ হয়নি দুর্ভোগ। ১৬ আগস্ট আবার নিটোরে ভর্তি হতে হয়। পরে সংক্রমণ দেখা দিলে আরও একটি অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তার হাতের তিনটি স্নায়ুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় জাহিদ ছিলেন সরকারি বরিশাল কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। কিন্তু এখন কোনোটিই স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে পারছেন না।
সরকারি সহায়তা নিয়েও রয়েছে তার হতাশা।
জাহিদ বলেন, ‘আমাদের একটা স্বাস্থ্যকার্ড দিয়েছে। কিন্তু এতে বাড়তি সুবিধা কী? সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষও তো চিকিৎসা পায়। একটা এক্স-রে আর ইসিজি ছাড়া নতুন কী পেলাম? আজীবন ফ্রি চিকিৎসার কথা বলা হয়, বাস্তবে তো সেটা দেখি না।’
তিনি জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন ও সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। তবে চিকিৎসার বড় অংশ চালাতে হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়।
এসময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
>> আরও পড়ুন
বর্তমানে তিনি নিয়মিত দীর্ঘ সময় ধরে ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। নিটোরে যেখানে কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যেত, সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুনর্বাসন চিকিৎসা নিতে পারছেন।
রাষ্ট্রের পরিবর্তন, বিচার ও জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে তার মিশ্র অনুভূতি।
তার ভাষায়, ‘কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু অনেক জায়গায় শুধু মানুষ বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি। আগে একদল ছিল, এখন আরেক দল বসেছে। আমরা তো হাত হারিয়েছি এই জন্য না যে পরে আবার অন্য কেউ এসে একই কাজ করবে।’
এক পর্যায়ে কিছুক্ষণ নীরব থেকে জাহিদ বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্ট লাগে, এখনো অনেক মানুষ চোখ রাঙায়। তখন মনে হয়, আমি কি এজন্য হাত হারালাম?’
রামপুরার সেই রক্তাক্ত বিকেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুই বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। কিন্তু জাহিদুল ইসলামের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। ডান হাত প্রায় অচল। থেমে যাওয়া পড়াশোনা, হারানো চাকরি আর মানসিক ট্রমা, সবকিছু নিয়েই নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে তার প্রশ্ন এখনও একই, জুলাইয়ে যে হাত হারিয়েছেন, সেই ত্যাগের মূল্য রাষ্ট্র কতটা দিতে পেরেছে?
এমএইচ/এএস