বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জুলাইয়ে পা হারানো আকাশের গল্প

‘যা’ বলার পর পেছন ফিরতেই গুলি করে পুলিশ

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম

শেয়ার করুন:

‘যা’ বলার পর পেছন ফিরতেই গুলি করে পুলিশ

‘না স্যার, আমাকে গুলি কইরেন না। আমি আন্দোলনে যাই নাই।’ পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার এভাবেই আকুতি করেছিলেন মোহাম্মদ আকাশ মিয়া। কিন্তু তার সেই মিনতিতে কর্ণপাত করেননি শটগানধারী পুলিশ সদস্য। বরং চলে যেতে বলার পর আকাশ পেছন ফিরতেই ট্রিগার টেনে দেন। মুহূর্তেই শটগানের শত শত ছররা বিদ্ধ হয় আকাশের পায়ে। ছিঁড়ে যায় রগ-রক্তনালী, শুরু হয় রক্তক্ষরণ। এরপর চার ঘণ্টা চিকিৎসার অপেক্ষা, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো, চিকিৎসা নিতে গিয়েও হুমকির মুখে পড়া-সব মিলিয়ে শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানান, তার পা আর রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ঢাকা মেইলের সঙ্গে এভাবেই ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতিচারণ করেন আকাশ। তিনি বলেন, ‘আমি নারায়ণগঞ্জে একটা মিষ্টির দোকানে সেলসম্যানের চাকরি করতাম। ১৫ জুলাই থেকেই আমরা আন্দোলনে ছিলাম। প্রতিদিন মিছিলে যেতাম। দোকানে তখন কাস্টমারও কম ছিল, তাই বেশিরভাগ সময়ই রাজপথে ছিলাম।’

তার ভাষ্য, ২০ জুলাই বিকেল ৪টা থেকে ৫টার দিকে আন্দোলনস্থলে পুলিশ গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে আসে। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে এক আন্দোলনকারী আহত হলে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিজের কর্মস্থলের ভেতরে ঢুকে পড়েন তিনি। কিন্তু সেখানেও রক্ষা হয়নি।

আকাশ বলেন, ‘দুইজন পুলিশ আমার পেছনে পেছনে দোকানের দিকে আসে। একজনের হাতে শটগান, আরেকজনের হাতে রাবার বুলেটের অস্ত্র ছিল। শটগানধারী আমাকে বলে, ‘তুই কেন আন্দোলনে গেছিলি? তুই অরিজিনাল আন্দোলনকারী। আমি শুধু বলতেছিলাম, স্যার, আমাকে গুলি কইরেন না। আমি আন্দোলনে যাই নাই। তখনই বুঝে গেছি, উনি গুলি করবেই। চোখে এমন রাগ ছিল, মনে হচ্ছিল গুলি না করে যাবে না। পরে বলল, যা। আমি পেছন ফিরতেই শটগান দিয়ে গুলি করে।’

শটগানের শত শত ছোট ছররা একসঙ্গে তার পায়ে লাগে। আকাশ বলেন, ‘আমার পায়ের রগ, রক্তনালী সব ছিঁড়ে যায়। তখন মনে হচ্ছিল পা-টা আর শরীরে নেই। নিচে তাকিয়ে দেখি শুধু রক্ত বের হচ্ছে।’

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাননি বলে অভিযোগ করেন আকাশ। স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে শুধু ব্যান্ডেজ করে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আকাশ বলেন, ‘পা তখন একদম ছিন্নভিন্ন। ওরা শুধু ব্যান্ডেজ করে বলল, বাংলাদেশ মেডিকেলে নিতে হবে। আশপাশে কোনো অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। ভ্যানগাড়িতে শুইয়ে রওনা হই। পরে একটা অ্যাম্বুলেন্স পাই।’

কিন্তু সেই অ্যাম্বুলেন্সও তাকে সরকারি হাসপাতালে না নিয়ে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আকাশ বলেন, ‘মানুষ যদি মারাও যায়, তারপরও টাকার চিন্তাই আগে। অ্যাম্বুলেন্সওয়ালারা কমিশনের জন্য আমাকে প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

3

সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আকাশের কণ্ঠে ফিরে আসে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার স্মৃতি। বলেন, ‘আমি বিকেল ৫টার দিকে গুলি খাইছি। আর চিকিৎসা শুরু হইছে রাত সাড়ে ৯টার দিকে। চার-পাঁচ ঘণ্টা বেডে পড়ে ছিলাম। কেউ আইসা দেখেও নাই।’

অস্ত্রোপচারের পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। তিন দিন পর চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, তার পা রক্ষা করা আর সম্ভব নয়। এরপর শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ানো।

আকাশ বলেন, ‘আব্বু আমাকে নিয়ে ট্রমা সেন্টার, ঢাকা মেডিকেল, পঙ্গু হাসপাতাল; সব জায়গায় দৌড়াইছে। ট্রমায় পায়ে ইনজেকশন দিয়ে দেখে কোনো অনুভূতি আছে কি না। আমি বললাম, কিছুই টের পাই না। তখন তারা বলে, ‘পা মারা গেছে, আর বাঁচবে না।’

পরে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে রক্তনালীর পরীক্ষা করেও একই সিদ্ধান্ত আসে। ২৩ জুলাই ভোরে তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি করা হয়। তবে তখনও অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি।

আকাশ বলেন, ‘শরীরে রক্ত কম ছিল। প্রায় আট ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পরে অপারেশন করে পা কেটে ফেলে। ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখছিল। ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমার একটা পা নাই।’

ফ্যাসিবাদী আমলের সেই সময় চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়াও ছিল আতঙ্কের। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবেন কি না, সেই শঙ্কা তাড়া করছিল আকাশকে।

তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলত, হাসপাতালে যাইয়েন না, গেলে গুলি করে মেরে ফেলবে। অ্যাম্বুলেন্সও কয়েক জায়গায় পুলিশ আটকাইছে। তখন সঙ্গে থাকা লোকজন বলছে, প্রেগন্যান্ট রোগী আছে। এরপর ছেড়ে দিছে।’

ওই বছরের আগস্টের ১ তারিখে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান। এরপর আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি। বলেন, ‘বাকি চিকিৎসা সব বাড়িতেই করছি।’

একটি পা হারানোর পর আকাশের পরিবারে চিকিৎসার ব্যয় মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় তিন লাখ টাকার এই খরচ মেটাতে তাদের ভরসা ছিল ধারদেনা আর স্বজনদের সহযোগিতা।

আকাশ জানান, ‘চিকিৎসার জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সব টাকা ধার করে চিকিৎসা করছি। বড় ভাইয়েরা সাহায্য করছে। তখন তো রসিদ, কাগজপত্র নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। পরে সরকার বলল, সব ডকুমেন্ট লাগবে। ডকুমেন্ট না থাকায় আর কিছু পাইনি।’

সরকারি সহায়তা নিয়েও তার আক্ষেপ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম দিকে গুলি খাইছি। চিকিৎসাও পাই নাই, সহযোগিতাও পাই নাই। যারা পরে আহত হয়েছে, অন্তত চিকিৎসাটা ঠিকমতো পাইছে। আমি সরকার থেকে শুধু জুলাই ফাউন্ডেশনের এক লাখ টাকা পাইছি।’

আকাশের দাবি, একটি পা হারানোর পরও তাকে ‘এ’ ক্যাটাগরির পরিবর্তে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। আকাশ বলেন, ‘আমার একটা পা নাই। তারপরও আমাকে ‘বি’ ক্যাটাগরি দিছে। যেখানে অন্তত ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকার কথা ছিল। কিন্তু একটা পা নিয়ে কত দৌড়াদৌড়ি করব? যাদের সব ঠিক আছে, তারা দৌড়ায়। আমাদেরটা সরকারেরই দেখা উচিত ছিল।’

তবে এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলায় পাশে দাঁড়ানোয় ব্র্যাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আকাশ। তার ভাষ্য, সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর আগেই ব্র্যাক তার পাশে দাঁড়ায়। বলেন, ‘ব্র্যাকের কথা না বললেই নয়। ওনারা হাসপাতালে এসে খোঁজ নিয়েছেন, আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। পরে কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ওনারা যদি দ্রুত পা না লাগিয়ে দিতেন, তাহলে হয়তো স্বাভাবিকভাবে হাঁটার অভ্যাসটাই ভুলে যেতাম।’

যে পুলিশ সদস্য তাকে গুলি করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেননি আকাশ। কারণ হিসেবে বলেন, ‘পুলিশের হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা ছিল। তখন এত ভয় আর আতঙ্কে ছিলাম যে, চেহারা বা নাম দেখার সুযোগই হয়নি।’

নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাসিন্দা আকাশ মিয়া এখন কৃত্রিম পায়ের ওপর ভর করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ক্ষত কিছুটা শুকালেও সেই স্মৃতির ক্ষত এখনো শুকায়নি। এখনো কানে বাজে একজন পুলিশ সদস্যের মুখে উচ্চারিত সেই শব্দ ‘যা’, যার পর গুলিতে চিরতরে হারিয়ে যায় তার একটি পা।

এমএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর