Dhaka Mail Logo

জাতীয়

৭ বছরের ভবন সুরক্ষা প্রকল্প, ১১ বছরেও হয়নি অর্ধেক কাজ!

আব্দুল হাকিম

১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম

  • ব্যয় বেড়েছে ২৯ শতাংশ, মেয়াদ বেড়েছে ৪৭ শতাংশ
  • চার বছর কেটেছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে
  • ৩০ অডিট আপত্তির ১৬টিই ঝুলে আছে
  • নির্ধারিত সভার ৬১ শতাংশই হয়নি
  • ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা
  • ব্যয় বৃদ্ধিতে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনকে ভূমিকম্প ও অগ্নিঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত করতে ২০১৬ সালে নেওয়া হয়েছিল একটি উচ্চাভিলাষী ‘নগরাঞ্চলের ভবন সুরক্ষা প্রকল্প’। পরিকল্পনা ছিল সাড়ে সাত বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। কিন্তু সেই প্রকল্প এখন প্রায় ১১ বছরে গড়ালেও শেষ হয়নি অর্ধেক কাজ। উল্টো সময়ের সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়, বেড়েছে মেয়াদ, ঝুলে আছে অডিট আপত্তি, নিয়মিত হয়নি তদারকি সভা, প্রকল্প পরিচালকের বারবার পরিবর্তনে ব্যাহত হয়েছে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা। আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়নেই চলে গেছে প্রায় চার বছর। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন সংস্থাই।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৩ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকল্পের নতুন মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালেও অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। একই সময়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ২৯ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং বাস্তবায়নের সময় বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। 

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, ফায়ার সার্ভিস অবকাঠামো এবং ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। তখন এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে সাত বছর। কিন্তু প্রথমে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ আরও বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে একটি সাড়ে সাত বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগছে প্রায় ১১ বছর। 

মেয়াদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে ব্যয়ও। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৭১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে যা ২৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। অথচ ব্যয় ও সময় বাড়লেও বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে একাধিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের ভবন নির্মাণ আন্তর্জাতিক দরপত্রের আওতায় হওয়ায় জাইকার শর্ত অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ঠিকাদারের অপারগতা এবং পরে অন্য ঠিকাদারের সঙ্গে দরকষাকষিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। শুধু দরপত্র মূল্যায়নেই প্রায় চার বছর চলে যায়। এতে পুরো প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে পড়ে। 

এতেই শেষ নয়। প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন, প্রকল্প এলাকা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্যাকেজে ভ্যারিয়েশন যুক্ত হওয়ায় বাস্তবায়নের সময় আরও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদর দফতর ভবনের নির্মাণস্থল পরিবর্তনও বিলম্বের অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে বিভিন্ন নির্মাণকাজে নতুন ভ্যারিয়েশন যুক্ত হওয়ায় পুনরায় অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালনায়ও ছিল অস্থিরতা। আইএমইডি বলছে, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিলম্ব, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়নে চার বছর সময় ব্যয়ের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। নিরীক্ষায় মোট ৩০টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হলেও এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪টি। বাকি ১৬টি আপত্তি এখনও অনিষ্পন্ন। আইএমইডি বলেছে, এসব আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এতগুলো আপত্তি ঝুলে থাকায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প তদারকির ক্ষেত্রেও একই ধরনের দুর্বলতা ধরা পড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) নিয়মিত সভা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। মে ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৪১টি সভা হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র ১৬টি। অর্থাৎ নির্ধারিত সভার মাত্র ৩৯ দশমিক ০২ শতাংশ হয়েছে। বাকি প্রায় ৬১ শতাংশ সভাই হয়নি। আইএমইডি বলছে, নিয়মিত সভা না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। 

প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১০ তলা বিশিষ্ট ফায়ার সার্ভিস সদর দফতর ভবন নির্মাণ, দুটি ফায়ার স্টেশনের রেট্রোফিটিং ও উল্লম্ব সম্প্রসারণ, চারটি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপক যান সংগ্রহ এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধী বেস আইসোলেশন প্রযুক্তি স্থানান্তর। কিন্তু আইএমইডির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদর দপ্তর ভবনের কাজ এখনও চলমান। কয়েকটি ফায়ার স্টেশনের কাজ প্রায় শেষ হলেও সামগ্রিক প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অন্যান্য অনিশ্চয়তাও প্রকল্পের জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইএমইডির কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ কমানো, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করতে তারা একাধিক সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় বিদ্যমান জটিলতা অনেকটাই কমবে এবং প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সহজ হবে বলে তারা মনে করেন।

তারা জানান, সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর করা, প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা এবং দরপত্র মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর শর্তাবলির সঙ্গে দেশের বিদ্যমান সরকারি ক্রয়বিধির সমন্বয় সাধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রক্রিয়াগত জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত না হয়।

আইএমইডির কর্মকর্তারা আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি জোরদার, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সুসংগঠিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা, নিয়মিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প পরিচালনা স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা আয়োজন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটকে জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার দিক থেকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও অধিক কার্যকর ও সময়োপযোগী হবে।

জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই প্রকল্পের সফলতা আসে না। কার্যকর পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সময়মতো সিদ্ধান্ত এবং শক্তিশালী তদারকি ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। আর এ প্রকল্পের বর্তমান চিত্র সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প ২০২৬ সালেও যখন অর্ধেক কাজ শেষ করতে পারেনি, তখন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে এসেছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা। একটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন না হলে শুধু ব্যয়ই বাড়ে না, এর মাধ্যমে জনগণও নির্ধারিত সময়ে সেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষ করে জননিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের বিলম্ব কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা না হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্র, নকশা পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিষয়গুলো আগেই বিবেচনায় আনতে না পারলে পরে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে।

বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ব্যয় বৃদ্ধিতে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি কার জন্য হচ্ছে তাকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

এএইচ/এএস