একে সালমান
০৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
২০ জুলাই ২০২৪। সেদিন দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়। জোরদার করা হয় সেনাবাহিনীর টহল। কারফিউ ভেঙে রাজধানীর বাড্ডা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সড়কে আন্দোলনে নামে ছাত্র-জনতা। পুরো দেশ, বিশেষ করে রাজধানীজুড়ে আন্দোলনের ভয়াবহ চিত্র ছিল সেদিন। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনরত অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। আবার অনেককে মৃত ভেবে রাস্তার পাশের ড্রেনের ধারে ফেলে রেখে যায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
আমিনুল ইসলাম ইমন। সেদিন তিনি বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে রমনা এলাকায় সারাদিন অবস্থান করছিলেন। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের সংগঠন আমরা জুলাই যোদ্ধা ফাউন্ডেশন-এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় নয়াপল্টন, গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছিলেন। সারা দেশে তখন কারফিউ জারি ছিল। কারফিউ ভেঙে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন চলছিল। আন্দোলন শেষে বিকেলে বাসায় ফেরার পথে পল্টন, গুলিস্তান ও সেগুনবাগিচাসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে মালিবাগ হয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। মালিবাগ রেলগেট এলাকায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আকস্মিক মুহুর্মুহু গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
যে ভয়াবহতা ঘুমাতে দেয় না
আমিনুল ইসলাম ইমন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি ২০ জুলাই বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয় এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলাম। সেদিন ঢাকায় কারফিউ চলছিল। কোথাও মানুষ রাস্তায় দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল না। কারফিউ ভেঙে বাড্ডা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে যায়। সেদিন বিকেলে আন্দোলনের মধ্যে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের সঙ্গে কয়েক দফা মোবাইল ফোনে কথা হয়। পরে তাকে আমার মোটরসাইকেলে নিয়ে আমরা একসঙ্গে বাসার দিকে ফিরছিলাম। মালিবাগ রেলগেটে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ কয়েকটি গাড়ি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু হয়। আমার পেছনে বসা রবিউল ইসলাম নয়ন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। আমিও মোটরসাইকেলসহ মাটিতে পড়ে যাই।
এরপর হঠাৎ করে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমে আমার শরীরে কয়েক রাউন্ড ছররা গুলি করে। তখনও আমার কিছুটা জ্ঞান ছিল। শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে কয়েকজন আমাকে ধরে ড্রেনের ধারে ফেলে রেখে যায়। তখন দেখি, আশপাশে অনেকের লাশ পড়ে আছে। ড্রেনের ধারে রাখার পর আমার শরীর সামান্য নড়ে ওঠে। আমি একটু উঠে বসার চেষ্টা করলে কয়েকজন এসে আবার আমার ডান পায়ে গুলি করে। গুলিটি পায়ের এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। গুলির পর পায়ে প্রচণ্ড জ্বালা অনুভব করি। এরপর আর পা নাড়াতে পারিনি। তবে আমার জ্ঞান ছিল। আশপাশে মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু উঠে বসা কিংবা দাঁড়ানোর মতো কোনো শক্তি ছিল না। তখনই বুঝতে পারি, আমি আর বাঁচব না। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দোয়া পড়তে থাকি। স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মনে মনে শুধু বলছিলাম, আল্লাহ, অন্তত আমার লাশের খোঁজটা যেন আমার পরিবার পায়।
তিনি আরও বলেন, আমি দীর্ঘ সময় ড্রেনের ধারে পড়ে ছিলাম। পরে হয়তো আমাকে সামান্য নড়াচড়া করতে দেখে আশপাশের বাসার লোকজন অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয়। অ্যাম্বুলেন্স এসে আমাকে গাড়িতে তোলে। গাড়িতে তোলার পর আমি কিছুটা কথা বলতে পারি। তখন আমার জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসে। আমি চালকের কাছে মোবাইল চেয়ে ছেলেকে ফোন করে শুধু বলতে পেরেছিলাম, আমি গুলি খেয়েছি, তোমরা ঢাকা মেডিকেলে আসো। এতটুকু বলেই আবার জ্ঞান হারাই। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে চোখ খুলে দেখি মতিঝিল এলাকা। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথে কয়েকবার পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে দেখতে চেয়েছিল আমি বেঁচে আছি কি না। আমি সব শুনতে পাচ্ছিলাম। তখন চালক বুদ্ধি করে পুলিশকে বলছিলেন, স্যার, লাশ নিয়ে যাচ্ছি। এরপর পুলিশ আর গাড়ি তল্লাশি করেনি। না হলে হয়তো আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতো।
আমি ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছানোর পর প্রথমে আমাকে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়। ততক্ষণে আমার স্ত্রী ও ছেলে হাসপাতালে ছুটে আসে। পরে আমার কিছুটা জ্ঞান ফিরলে আমি নড়াচড়া করি। তখন চিকিৎসকেরা এসে চিকিৎসা শুরু করেন। এরপর আমার পরিচিত এক চিকিৎসক এসে অবস্থা গুরুতর দেখে আমাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করান। সেখানে কয়েকটি অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসা চলতে থাকে। এর আগে চিকিৎসকদের অবহেলায় আমার গুলিবিদ্ধ পা কেটে ফেলতে হয়। বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা শেষে আমাকে সাভারের সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক মাস চিকিৎসার পর আমি নতুন জীবন ফিরে পাই।
তিনি আরও বলেন, একবার ঢাকা মেডিকেলে আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমি মারা যাচ্ছি বলে মনে হয়েছিল। প্রায় ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড আমার নিঃশ্বাস বন্ধ ছিল। তখন চিকিৎসকসহ সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সবাই ভেবেছিলেন, আমি মারা গেছি। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ আমাকে আবারও বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আমি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আমার জীবন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে একেবারে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি কখনো ভাবিনি, আর বেঁচে ফিরতে পারব। কয়েকটি লাশের মাঝখান থেকে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমি অনেককে দেখেছি, যারা আন্দোলনে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও চিকিৎসায় চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। আমাদের চিকিৎসার এমন অবস্থা দেখে চিকিৎসাধীন ৮০ জনের বেশি আহত একত্রিত হয়ে আমরা জুলাই যোদ্ধা ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। এরপর ধীরে ধীরে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের নিয়ে আমরা কাজ শুরু করি।
সরকারের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহত ও নিহত সবাইকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে এবং তাঁদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে।
একেএস/এআর