Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‎রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে স্বীকৃতিহীন শহীদ শিশু সাব্বির

একে সালমান

০৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

  • নিরক্ষর বাবা-মা সন্তানের স্বীকৃতি পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন
  • ডিসি অফিস থেকে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন—সবাই দিচ্ছেন আশ্বাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শিশু সাব্বিরের পরিবারের দুই বছরের অপেক্ষার অবসান হয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও এখনো সেই স্বীকৃতি পায়নি পরিবারটি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, প্রশাসনিক জটিলতা এবং এক দফতর থেকে আরেক দফতরে ঘুরতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নিরক্ষর বাবা-মা। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো অনুদান পাননি তারা।

পরিবারের দাবি, আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাব্বির মারা যায়। ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট দফতর ও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবারই আশ্বাস মিলেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা স্বীকৃতি মেলেনি।

সাব্বিরের বাবা-মা ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা লেখাপড়া জানি না। কী কী কাগজ লাগবে, কোথায় আবেদন করতে হবে কিংবা কোন দফতরে যেতে হবে, তা-ও জানি না। এরপরও মানুষের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে ডিসি অফিস থেকে শুরু করে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে জমা দিয়েছি। প্রায় দুই বছর ধরে এক দফতর থেকে আরেক দফতরে ঘুরছি। কিন্তু এখনো কোথাও থেকে আমার ছেলের বিষয়ে কোনো সমাধান বা স্বীকৃতি পাইনি।

Sabbir

যেখানে শহীদ হয় শিশু সাব্বির

পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে বাবার পাশাপাশি অল্প বয়সেই রোজগারে নামতে হয় সাব্বিরকে। মাত্র ১১ বছর বয়সে ফ্লাস্কে করে ধানমন্ডি লেক ও আশপাশের এলাকায় চা বিক্রি করত সে। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজধানীসহ সারা দেশ। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কেঁপে উঠছিল চারপাশ। এমন পরিস্থিতিতেও চায়ের কেটলি হাতে বাসা থেকে বের হয়ে ধানমন্ডি এলাকায় চা বিক্রি করতে যায় সাব্বির।

ধানমন্ডির আবাহনী মাঠসংলগ্ন সড়কে পৌঁছানোর পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শিশু সাব্বিরের বুক। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দফতরে দফতরে ঘুরে পরিবারের আক্ষেপ

শহীদ সাব্বিরের মা মাকসুদা বেগম আহাজারি করতে করতে ঢাকা মেইলকে বলেন, ওই দিন বহু কষ্টে আমার প্রিয় সন্তান সাব্বিরের লাশ হাসপাতাল থেকে এনে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করি। আমার ছেলের জানাজায় কেউ ভয়ে আসতে চাইছিল না। কারণ তখন ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার ঘুরে ঘুরে মানুষের জটলা দেখলেই গুলি করছিল। কিছুক্ষণ পরপর গুলির শব্দে সবাই আতঙ্কে ছোটাছুটি করে চলে যেত। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আমার বুকের ধন একা একা কবরে শুয়ে আছে।

তিনি বলেন, গত দুই বছর বিভিন্ন দফতরে গিয়েছি। এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে যেতে বলা হয়েছে আর আমি সন্তানের স্বীকৃতির জন্য যাইনি। কিন্তু কেউ আমার সন্তানকে শহীদের স্বীকৃতি দিতে আগ্রহ দেখায়নি। আজ (৬ জুলাই) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছি। এর আগেও আজ যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। দুই বছর ধরে আমার সন্তানের কোনো স্বীকৃতি পাইনি।

sabbir

সাব্বিরের বাবা নূর আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি রিকশাচালক। ছোট তিন সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার আজিজ খান রোডের একটি টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকি। আমি মাঝেমধ্যে অসুস্থ থাকতাম। তাই আমার শিশু সন্তান চা বিক্রি করে সংসারে সাহায্য করত। আন্দোলনের সময় আবাহনী মাঠের কাছে গুলিতে সে শহীদ হয়। সন্তান শহীদ হওয়ার পর ডিসি অফিস, এনসিপির কার্যালয়, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন—সব জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু কোথাও কোনো সহায়তা পাইনি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে।

তিনি বলেন, প্রায় দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত কেউ এসে খোঁজ নেয়নি। শহীদ হিসেবে দুই বছরেও আমার সন্তানের নাম জুলাই ফাউন্ডেশনের তালিকায় ওঠেনি। গেজেটভুক্তও হয়নি। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে কয়েকবার গিয়েছি, কিন্তু তাদের পক্ষ থেকেও কোনো সহায়তা পাইনি। 

তিনি আরও বলেন, ধানমন্ডি এলাকায় প্রচণ্ড গোলাগুলির খবর শুনে আমি ও আমার স্ত্রী ছেলেকে খুঁজতে বের হই। কিন্তু কোথাও তাকে পাইনি। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে অনেক অনুরোধ করে সিসিটিভি ফুটেজে আমার ছেলের লাশ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। দেখি, অনেক মানুষের লাশের মধ্যে আমার ছেলেও পড়ে আছে।

এ বিষয়ে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর ঢাকা মেইলকে বলেন, এখনও যাদের নাম শহীদ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়নি, তাদের বিষয়ে খুব শিগগিরই বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এমআইএস বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে রয়েছে। তারা এ কাজ সম্পন্ন করলেই আমরা শহীদদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারব।

তিনি আরও বলেন, যেসব শহীদের নাম এখনও গেজেটভুক্ত হয়নি, তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। শিগগিরই মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের নাম গেজেটভুক্ত করবে।

জুলাই-আগস্টে শহীদদের নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত

এদিকে সরকার ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে মন্ত্রণালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এ তথ্য জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, চব্বিশের ১৬ জুলাই দুটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যার প্রভাব শুধু দেশের ভেতরেই নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনা আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছিল।

sabbir

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং শহীদদের স্মরণে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর তৎকালীন নিপীড়নের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্যাম্পাসে ‘ক্যাম্পাসের ক্ষতচিহ্ন বা প্রতিরোধের সূচনা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

এরপর ১৮ জুলাই দেশব্যাপী ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে’ পালন করা হবে। ওই দিন আর্মি স্টেডিয়ামে একটি বড় প্রতিবাদ সমাবেশ ও প্রতিবাদী গানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৪ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র যাত্রাবাড়ীতে একটি বিশেষ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

পাশাপাশি আগামী ৫ আগস্ট ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করবে সরকার। এ দিন চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একেএস/এআর