সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

শহীদদের পূর্ণাঙ্গ গেজেটসহ ৫ দাবি জুলাই আন্দোলনের সংগঠকদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

শেয়ার করুন:

শহীদদের পূর্ণাঙ্গ গেজেটসহ ৫ দাবি জুলাই আন্দোলনের সংগঠকদের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিতসহ পাঁচ দফা দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছা) সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠকরা। তাদের দাবি, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে এসব প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নাজমুস সালেহী। এ সময় বৈছার সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠক, বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।

নাজমুস সালেহী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য, মেধার অবমূল্যায়ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার সংকট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণজাগরণ। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ২৩ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

তিনি বলেন, সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি, গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী প্রবণতা জনগণের প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। জুলাইয়ের অর্জন ও আত্মত্যাগ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; বরং এটি সমগ্র দেশের জনগণের সম্মিলিত সংগ্রামের ফল। 

সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তারা পাঁচ দফা দাবি ও প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রথম দাবিতে বলা হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত নেতৃত্বের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। আন্দোলনের সংগঠক, সমন্বয়ক, নেতৃত্বদানকারী ও বাস্তবায়নকারীদের অবদান তথ্যভিত্তিকভাবে রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে যারা ইতিহাস বিকৃত বা প্রকৃত নেতৃত্বকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

দ্বিতীয় দাবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত এবং সম্মুখসারির যোদ্ধাদের একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও কঠোরভাবে যাচাইকৃত রাষ্ট্রীয় গেজেট প্রকাশের দাবি জানানো হয়। সংগঠকদের ভাষ্য, পূর্বে প্রকাশিত গেজেটে প্রকৃত অনেক যোদ্ধার নাম বাদ পড়েছে এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ রয়েছে। তাই নিরপেক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকা পুনর্বিবেচনা করে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি গেজেটভুক্ত আহত যোদ্ধাদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়।

তৃতীয় দাবিতে ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতা, তনু হত্যাকাণ্ড, ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তারা।

চতুর্থ দাবিতে সরকারি ও বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক, প্রশাসনিক ও পরিচালনা পর্ষদকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। তারা অভিযোগ করেন, এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতমূলক আচরণ, শিক্ষার্থীদের হয়রানি এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা বিদ্যমান। এসব দূর করে মেধাভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।

পঞ্চম দাবিতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাঠামোগত সংস্কার এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বান্ধব উচ্চশিক্ষা নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। সংগঠকদের মতে, দেশে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নেই। একই সঙ্গে ইউজিসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বও অত্যন্ত সীমিত। তাই নীতিনির্ধারণে যোগ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং গবেষণার জন্য সরকারি অনুদান বৃদ্ধির দাবি জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গঠনের একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। কিন্তু প্রায় দুই বছর পরও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। নবগঠিত সরকারের হাতে সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার জন্য এখনো সময় রয়েছে। সরকার জনগণের প্রত্যাশা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বৈছার সাবেক সমন্বয়ক ও সংগঠক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়াত উল্লাহ, ইউআইটিএস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাখাওয়াত হোসেন ইমন, জুলাই যোদ্ধা কামরুল হাসানসহ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যরা।

তারা বলেন, প্রকৃত ইতিহাসের স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়িত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

এএইচ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর