Dhaka Mail Logo

জাতীয়

ঝড়-বৃষ্টি-ট্রাফিক জ্যাম, ভাড়া বাড়ে হরদম

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৪০ এএম

গত বৃহস্পতিবার অফিস শেষে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১০ নম্বর সড়ক থেকে বাসায় ফিরছিলেন দুই সহকর্মী রাতুল ও সজীব। নতুনবাজার প্রান্তে যাওয়ার জন্য দুজনে একটি রিকশায় ওঠেন। এই এলাকায় ভাড়া নির্ধারিত থাকায় চালকের সঙ্গে আগে থেকে দরদাম করার প্রয়োজন মনে করেননি তারা। গন্তব্যে পৌঁছে ৫০ টাকার নোট দিলে চালক ২০ টাকার পরিবর্তে ফেরত দেন ১০ টাকা। বাকি ১০ টাকা চাইলে রিকশাচালক শান্তভাবেই বলেন, ‘আজ খুব গরম, তাই ভাড়া ৪০ টাকা রেখেছি।’ তার এমন উত্তরে দুই সহকর্মী তর্কে না জড়িয়ে বাড়তি ১০ টাকা দিয়েই বাসার পথ ধরেন।

একইদিন সকালে বাড্ডা লিংক রোড থেকে নতুনবাজার যান রাশেদুল ইসলাম। বারিধারা জে ব্লক এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি।

রাশেদুল জানান, প্রতিদিন সকালে বাসে করে অফিসে যান তিনি। কিন্তু বিশেষ কারণে দেরি হওয়ায় সেদিন সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে বের হন। অতিরিক্ত যাত্রী ও গরমের কারণে বাসে না চড়ে রিকশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভাড়ার কথা জিজ্ঞাসা করলে এক রিকশাচালক ৫০ টাকার ভাড়া ৮০ টাকা চান। পরে আরও কয়েকটি রিকশা দেখে শেষ পর্যন্ত ৭০ টাকা দিয়ে গন্তব্যে যান।

শুধু দুটি ঘটনাই নয়। শীত, বৃষ্টি, যানজট, গরম, অফিস সময়, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা গণপরিবহন সংকট-যেকোনো পরিস্থিতিতেই একশ্রেণির চালকদের বাড়তি ভাড়া চাওয়ার প্রবণতা এখন অনেকটা ‘নিয়মে পরিণত হয়েছে’।

auto-1
ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের অসহায়ত্বের সুযোগে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন অটোরিকশার চালকরা।

যাত্রীরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েন। গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া থাকায় উপায় না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়েই বাড়তি ভাড়া দিয়ে যান। আর চালকদের দাবি, অনেক সময় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাড়তি সময়, শ্রমের কারণে তারা বেশি ভাড়া চান।

বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাইফুল ইসলাম থাকেন মিরপুরে। অধিকাংশ সময় বাসে চড়ে কর্মস্থলে গেলেও মাঝেমধ্যে রিকশাতেও যান। ঢাকা মেইলকে সাইফুল বলেন, “সাধারণত ফার্মগেট থেকে বাসায় যেতে রিকশা ভাড়া দিতে হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। কিন্তু বৃষ্টি হলেই ২০০ থেকে ২৫০ টাকার নিচে কেউ যেতে চায় না। দামাদামি করলে বলে ‘যেতে হলে যান, না হলে অন্যটা দেখেন।”

অফিস শুরুর আগে রিকশার বাড়তি ভাড়া চাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান বেসরকারি চাকরিজীবী আমিরুল ইসলামও। ঢাকা মেইলকে তিনি জানান, নদ্দা থেকে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১৩ নম্বর গেটের রিকশা ভাড়া ২০ টাকা। কয়েকদিন আগে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সড়কে পানি জমায় দরদাম না করেই একটি রিকশায় ওঠেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ২০ টাকা ভাড়া ৪০ টাকা দিলেও তা নিতে রাজি হননি চালক। তিনি ১০০ টাকা চেয়ে বসেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ৬০ টাকা দিয়ে চলে আসেন এই চাকরিজীবী।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আমিরুল বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই রিকশাভাড়া দুই-তিন গুণ বেড়ে যায়। অফিসে সময়মতো পৌঁছানোর তাড়া থাকায় বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সড়কে সামান্য পানি জমলেই যদি ২০ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা হয়ে যায়, তাহলে আমাদের চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের নৈরাজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি দরকার।’

শুধু রিকশাই নয়, সিএনজি অটোরিকশা ও রাইড শেয়ার চালকদের অবস্থাও একই। সুযোগ পেলে তারাও যাত্রীদের পকেট কাটতে দ্বিধা করেন না। চাহিদা বেশি দেখলেই মিটারে যেতে রাজি হন না অটোরিকশার চালকরা। আর রাইডশেয়ার বাইকচালকের দাবি অ্যাপের ভাড়ার বাইরেও অতিরিক্ত টাকা।

ধানমন্ডির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘যাত্রী বেশি দেখলে অটোরিকশা চালকরা মিটারে যেতে রাজি হন না। পরে দামাদামি করে বাড়তি টাকা দিয়ে যেতে হয়। অনেক সময় নিরাপত্তার কথা ভেবে বা রাত হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাজি হতে হয়।’

মধুবাগে থাকা রুবেল হোসেন বলেন, ‘বাইক রাইড বুক করলেও অনেক সময় চালক ফোন দিয়ে বলেন, জ্যাম অনেক, ৫০-১০০ টাকা বাড়িয়ে দিলে আসছি। না দিলে ট্রিপ বাতিল করে দেন।’

riksha-2
বৃষ্টি, রোদ কিংবা যানজট। পরিস্থিতি বদলালেই বেড়ে যায় রিকশার ভাড়া। এতে ভোগান্তির শিকার হন যাত্রীরা। কোলাজ ঢাকা মেইল।

তবে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার পেছনে চালকদেরও রয়েছে নিজস্ব ব্যাখ্যা। রিকশাচালক জয়নুল বলেন, ‘রোদ-বৃষ্টিতে রিকশা চালানো অনেক কষ্ট। এ সময় কম ট্রিপ দেওয়া যায়। বৃষ্টিতে কাপড় ভিজে যায়। অসুস্থ হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। তাই একটু বেশি ভাড়া চাই।’

সিএনজি অটোরিকশার এক চালক বলেন, ‘অফিস সময়ে রাস্তায় অনেক যানজট থাকে। এক ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকলে অনেক ক্ষতি হয়। গ্যাস, জমা আর দৈনিক খরচ তুলতে বাড়তি ভাড়া নিতে হয়।’

চাহিদার সময় ভাড়া বাড়ানোর এই সংস্কৃতির পেছনে কার্যকর নজরদারির অভাব আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে মিটার ব্যবহার নিশ্চিত করা, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত অভিযান চালালে এই প্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করেন তারা।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত না হলে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা কমবে না। ফলে ঝড়-বৃষ্টি-রোদ বা যানজট দেখলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে যাত্রীদের।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্ষাকালে গণপরিবহন সংকট দেখা দিলে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা কিংবা রাইড শেয়ারিং সেবার ওপর নির্ভর করেন। এ সুযোগে অনেক চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেন, যা এক ধরনের অতি মুনাফাভিত্তিক ও শোষণমূলক প্রবণতা।

picture_2
পরিস্থিতি বুঝে সড়কে রিকশার চাকার মতো ঘোরে ভাড়ার অঙ্কও।

‘শুধু বর্ষাই নয়, যানজট, ঈদ, অফিস সময় কিংবা যাত্রীচাপ বৃদ্ধির মতো যেকোনো পরিস্থিতিকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের চেষ্টা করা হয়। মূলত যাত্রীদের অসহায়ত্বকেই পুঁজি করে এ ধরনের অনিয়ম চলে। কারণ, তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ জানানোর বা প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান।’

এ সমস্যা সমাধানে করণীয় তুলে ধরে নাজের হোসাইন বলেন, ‘যাত্রীদের হয়রানি রোধে দ্রুত ও কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যাত্রীসেবার জন্য বিশেষ হেল্পলাইন বা তাৎক্ষণিক প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর আদলে কোনো ব্যবস্থা থাকলে যাত্রীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং ঘটনাস্থলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

‘এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা না থাকলে যাত্রী হয়রানি এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন।’

এমআর