Dhaka Mail Logo

জাতীয়

চব্বিশের ২ জুলাই: পুলিশ হটিয়ে প্রথমবার শাহবাগ অবরোধ

মোস্তাফিজুর রহমান

০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

দেশের ইতিহাসে কালজয়ী রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ২০২৪ সালের জুলাই মাস। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আন্দোলন স্বৈরাচারী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠন এবং বিপথগামী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাখির মতো গুলি করে শত শত ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। দীর্ঘ ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট দম্ভের পতন ঘটে এবং স্বৈরাচারী হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

সেই আন্দোলনের উত্তাপে একটি মাস হয়ে উঠেছিল ৩৬ দিনের, দীর্ঘ এক সংগ্রামের নাম। তাই ‘৩৬ জুলাই’ শুধু একটি প্রতীকী তারিখ নয়— এটি হয়ে উঠেছে দেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রক্তাক্ত সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ‘৩৬ জুলাই’ হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার পরবর্তী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের মুহূর্ত।

ওই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে, যেখানে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এর প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক কোটা প্রথা বিলুপ্তিসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে আসে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ৩৬ দিন তথা ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলে নানা কর্মসূচি।

চব্বিশের ২ জুলাই যা ঘটেছিল
দিনটি ছিল মঙ্গলবার। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে এ দিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ শুরু হয়। ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হন। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাব হয়ে শাহবাগে এসে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ার কারণে শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

 

ওইদিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মিছিলে আন্দোলনকারীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘কোটাপ্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’— এমন নানা স্লোগান দেন। মিছিলটি শাহবাগ মোড়ে আসে বিকেল পৌনে ৪টার দিকে।

দৈনিক কালবেলা পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশিত ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলটি শাহবাগে পৌঁছানোর আগেই সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান নেন।

‘বিকেল পৌনে ৪টার দিকে মিছিলটি শাহবাগ মোড়ে পৌঁছায়। অবশ্য তার আগেই সেখানে সড়কের ওপর বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিলেন। মুখোমুখি হয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীরা পুলিশকে ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে পুলিশ সরে যায়’, বলা হয় কালবেলা পত্রিকার খবরে।

ওইদিন বিকেলে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের অনলাইনে প্রকাশিত একটি খবর ছিল, ‘কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে এক ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ’।

student_movement_july_ii

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে শাহবাগ মোড়ে অবরোধ করেছে চাকরিপ্রার্থী কয়েকশ শিক্ষার্থী। আজ বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তারা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে জড়ো হয়ে অবরোধ করে। প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে অবস্থানের পর ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সরে যান। অবরোধের কারণে বাংলামোটর থেকে শাহবাগ, শাহবাগ থেকে সায়েন্সল্যাব, কাকরাইল সড়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন।’

পরে শাহবাগ থেকে মিছিলটি নিয়ে শিক্ষার্থীরা তৎকালীন ঢাবি উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন বলেও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়। আন্দোলন প্রসঙ্গে অন্যতম সংগঠক নাহিদ ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘৩০ জুন পর্যন্ত আমাদের আল্টিমেটাম ছিল। গতকাল থেকে আবার আমরা বিক্ষোভ শুরু করেছি। আগামী কয়েকদিন বিক্ষোভ চলবে।’

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আন্দোলনের সংগঠক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ বলেন, "আমরা কোটা বাতিলে ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবি করছি। সরকার যদি যৌক্তিকভাবে কোটা সংস্কার করতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেব। কিন্তু আমরা সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের বিষয়টি মানি না।"’

ঢাকা টাইমস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ছিল— ‘কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবিতে সারা দেশে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবিতে আগামী ৩ ও ৪ জুলাই দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন কোটা সংস্কারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা এই ঘোষণা দেন।’ 

student_movement_1

এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী— ২ জুলাই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে চারটি দাবি তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো—
১। ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখতে হবে।

২। ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সকল গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

৩। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে।

৪। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এএম/ক.ম