ঢাকা মেইল ডেস্ক
২০ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার একসঙ্গে দুই দেশ তথা মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে এবং চীনের সঙ্গে রফতানিতে আশার আলো দেখছে দেশের মানুষ।
শনিবার (২০ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর নিয়ে বিস্তারিত জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
তিনি জানান, রোববার (২১ জুন) দুপুরে দুই দিনের জন্য প্রথমে মালয়েশিয়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে তার এই সফর। এরপর ২২ জুন রাতে মালয়েশিয়া থেকে যাবেন চীনে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার চালুর আশা
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, মালয়েশিয়া সফরকালে আগামী সোমবার (২২ জুন) দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে দুই দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ওই বৈঠকে পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক বিষয় আলোচনা হবে। আলোচনার ইস্যু হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও কৃষি, শিক্ষা ও জনযোগাযোগ। এসব ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা স্থাপন নিয়ে আলোচনা হবে।

বৈঠকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়া হবে। এছাড়া এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় আর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুটি দলিল সইয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিগত সময়ে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রেখেছিল মালয়েশিয়া। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় শ্রমবাজারটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। মালয়েশিয়ায় নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবা খাতে বিদেশি শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশটিতে বিভিন্ন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মাসিক মজুরিও বেড়েছে।
বর্তমান সরকার বারবার জোর দিচ্ছে যে, এবার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা মনোপলি (একচেটিয়া ব্যবসা) সহ্য করা হবে না। অভিবাসন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার জন্যও আলোচনা চলছে।
চীনের সঙ্গে রফতানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। যে দেশ একসময় শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম আমদানির উৎস ছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে এখন সেই দেশেই রফতানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতাদের আশা, এই সফরের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রফতানি তিন বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি হবে।
পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে দেশটিতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। চীনের ব্যবসায়ীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও সম্ভাবনা তুলে ধরবেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বানও জানাবেন।
একই দিন বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বৈঠকের পর চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে।

এই সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সহযোগিতার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশাপ্রকাশ করেন পররাষ্ট্র সচিব। বিনিয়োগের জন্য চীনের বেসরকারি খাতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব আরও জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া এবং তারপর চীনে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর শেষে আগামী ২৬ জুন বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রসঙ্গত, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। প্রায় ১৪০ কোটির বেশি মানুষের এই বাজারে খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, শিল্প কাঁচামাল, ভোক্তা সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, প্রযুক্তি উপকরণ থেকে শুরু করে হাজারো পণ্যের চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২০ সাল থেকে ধাপে ধাপে চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। প্রথমে ৯৭ শতাংশ, পরে ৯৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে বেইজিং।
কিন্তু এত বড় সুবিধা পাওয়ার পরও বাংলাদেশের রফতানি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। কারণ বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়ি এখনো অত্যন্ত সীমিত। তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যই মূলত চীনে রফতানি হয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চীনে সবচেয়ে বেশি রফতানি হয়েছে তৈরি পোশাক। এরপর রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, হোম টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক সামগ্রী।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। ফলে শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর করে এই বাজারে বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। বরং নতুন নতুন পণ্য নিয়ে দেশটির বাজারে প্রবেশ করতে হবে।
এএইচ