images

জাতীয়

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের!

আব্দুল হাকিম

১৯ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

  • তিন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সমালোচনা
  • স্কুলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়েও বিতর্ক
  • কিছু প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে তোলা হয় প্রশ্ন
  • নিয়োগসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও বিতর্ক ওঠে
  • সংসদে অভিযোগ অস্বীকার করেন প্রতিমন্ত্রী
  • প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে, জানায় প্রশাসন

দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম একের পর এক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছেন। ইউনিয়ন পুনর্গঠন ও নামকরণ থেকে শুরু করে উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু ঘিরেই এখন উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন। সংসদে উত্থাপিত অভিযোগ, বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন মিলিয়ে বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও এ নিয়ে অস্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। তবে প্রতিমন্ত্রী এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে বলছেন, প্রতিটি সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে আইনগত কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই।

বিতর্কের সূচনা মূলত বগুড়ার শিবগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় নতুন ইউনিয়ন গঠনের পর নামকরণকে ঘিরে। সংসদে বিরোধী দলীয় একজন সদস্য অভিযোগ তোলেন, নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম এমনভাবে রাখা হয়েছে, যা প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক পরিচয় ও তার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে যায়। বিষয়টি সংসদে দাঁড়িয়ে আলোচনা হওয়ার পরই রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

জানা যায়, একটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’। আর অন্য দুটি ইউনিয়নের নাম ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। ‘মীরবাড়ী’ তার নিজের নামে আর তার দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।

আর যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজিকে পরিবারের সদস্যরা ‘স্বর্ণ’ নামে ডাকেন। এ কারণে মোকামতলা উপজেলার ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত নতুন ইউনিয়নের নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’ রাখা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। প্রশ্ন তোলা হয় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও। তবে প্রতিমন্ত্রী সংসদে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নামকরণ সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও ভৌগোলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে হয়েছে, ব্যক্তিগত কোনো প্রভাব এখানে নেই।

এই ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়েও নামকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিছু সংবাদমাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, তারা নামকরণের আগে কোনো গণশুনানি বা উন্মুক্ত মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়ার কথা জানেন না। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পুনর্গঠনের প্রস্তাব স্থানীয় পর্যায়ের কমিটি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দফতরের সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই দুই ভিন্ন বক্তব্যের কারণে স্থানীয় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

সংসদে বিরোধী সদস্যরা এ বিষয়ে আরও প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন নামকরণ বিতর্ক তৈরি করছে এবং এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না। সংসদীয় আলোচনায় বিষয়টি নিয়ে উত্তাপ তৈরি হলে প্রতিমন্ত্রী পুনরায় বলেন, এটি কাকতালীয় এবং রাজনৈতিকভাবে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সন্তানদের নামে ইউনিয়নের নাম: সংসদে ব্যাখ্যা দিলেন প্রতিমন্ত্রী

এই বিতর্কের মধ্যেই একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিয়ন নামকরণ বিতর্কটি কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেখানে বলা হয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে। একই প্রতিবেদনে প্রশাসনের পক্ষের ব্যাখ্যাও তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয় নামকরণ ও পুনর্গঠন নিয়ম অনুসারেই হয়েছে এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের কোনো প্রমাণ নেই।

Sahe-Alam2
সংসদে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন প্রতিমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিও ক্লিপ, সংসদের বক্তব্যের অংশ এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা বিতর্ককে আরও বিস্তৃত করে। তবে এসব অনলাইন আলোচনার বড় একটি অংশ যাচাইযোগ্য তথ্যের বাইরে চলে গেছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাস্তব তথ্য এবং অনলাইন ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দুই ছেলে ও ভাতিজির নামে ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ নিয়ে বিতর্কের রেশ না কাটতেই আবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব উঠেছে। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ করার প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জমা পড়ে। এরপর বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে মতামত দিতে বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সরকারী সচিব শিরিন আক্তার স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে বলেন, বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে নামকরণের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি সরজমিন পরিদর্শন করে সুস্পষ্ট মতামত ও যৌক্তিকতাসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রস্তাব সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বোর্ড ও জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে।

এরপর আবারও নতুন বিতর্ক- প্রতিমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীদের তপ্ত রোদের মধ্যে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। যা নিয়ে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার (১৭ জুন) বগুড়ার শিবগঞ্জের রোকেয়া সাত্তার মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে।

আরও পড়ুন

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ‘ক্যাপ্টেন’ ছিলেন তারেক রহমান: মীর শাহে আলম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার আলিয়ারহাটে অবস্থিত রোকেয়া সাত্তার মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এ আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এতে ৪২৮ জন উপকারভোগীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড ও ১টি করে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।

এ আয়োজনে তপ্ত রোদে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর তপ্ত রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন ভিডিও নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। রাষ্ট্রীয় এ আয়োজনের সাথে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Sahe-alam3
নানা অনিয়মের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। ছবি: সংগৃহীত

‎অভিযোগ উঠেছে, মোটা অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে মীর শাহে আলম আব্দুর রশিদ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন। এমনকি বিষয়টি জানতেন না স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যদিও পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সরাসরি তার দৃষ্টিগোচর হলে বাতিল করা হয় নিয়োগটি৷

এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন সড়ক ও সেতু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বণ্টন নিয়ে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক পরিসংখ্যান ও প্রকল্প তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট একটি সময়কালে সারা দেশে সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে তিন হাজারেরও বেশি সড়ক ও সেতু প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোতে বড় ধরনের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়, যেখানে কিছু প্রকল্পের ব্যয় কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত এবং কিছু প্রকল্প অতি স্বল্প পরিসরে নির্ধারিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিরোধী দলে মুক্তিযোদ্ধা নেই—প্রতিমন্ত্রীর দাবি নাকচ স্পিকারের

জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে অভিযোগ উঠেছে যে, বগুড়া জেলা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প বরাদ্দ পেয়েছে, যা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গাজীপুর জেলার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই ব্যবধানকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন বণ্টনে ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গড়ে কয়েকটি জেলার সমান প্রকল্প এককভাবে একটি জেলায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে দেখা গেছে।

জেলার ভেতরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৭৪ কোটি টাকার সড়ক ও সেতু প্রকল্প বরাদ্দ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জেলার মোট বরাদ্দের একটি বড় অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে জেলার অন্যান্য উপজেলায় তুলনামূলকভাবে কম বরাদ্দ যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এর বাইরে উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রকল্প বণ্টন নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও সেতু প্রকল্পে তুলনামূলকভাবে বড় অংশের বরাদ্দ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে কিছু নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে। কিছু প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ঠিকাদারি সম্পর্ক থাকতে পারে এমন প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব দাবি এখনো কোনো সরকারি তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষ এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, কিছু ক্ষেত্রে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বড় প্রকল্পগুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এখানে কোনো অসঙ্গতি নেই।

রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব বিতর্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্তব্য করেন, চলমান বিতর্ক সরকারের ভাবমূর্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক ইউনিয়ন নামকরণ বিতর্ক এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, উন্নয়ন প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, তত বেশি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

এছাড়া মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। সেই মামলায় এই সরকারের আমলে প্রথম সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে।

Sahe-alam4
শাহে আলমকে নিয়ে বিব্রত বিএনপি। ছবি: সংগৃহীত

দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, সরকারের প্রাথমিক সময়কালেই যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ধারণ ও জনআস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অভিযোগ এবং বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রক্রিয়া অপরিহার্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী বলেন, যদি মেনেও নেওয়া হয় যে নামগুলো কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে, তবু প্রশ্ন থাকে—নামগুলো চূড়ান্ত করার আগে কেন তা থামানো হয়নি। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানেন, এখন এটি সম্পূর্ণ তার সিদ্ধান্ত যে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন; এ বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ নেই।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রতিমন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি। সমালোচকরা বলছেন, নির্বাহী বিভাগের একজন সদস্য অন্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে থাকলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এটি সংসদীয় নজরদারির মূল উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সংসদীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, এটি প্রচলিত প্রক্রিয়ার অংশ এবং আইনগতভাবে এতে বাধা নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং তথ্যভিত্তিক জবাবদিহি। অভিযোগ সত্য বা অসত্য যাই হোক না কেন, জনআস্থার জন্য একটি পরিষ্কার, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়। না হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘায়িত হয় এবং তা সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। যখন তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশের বিভিন্ন ভবন ও সংস্থা থেকে কীর্তিমান মানুষদের নাম মুছে দিচ্ছেন, আবার তারই সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পরিবার ও স্বজনদের নামে নতুন-নতুন নামকরণ করছেন। এট দুঃখজনক।

আরও পড়ুন

‘বেফাঁস’ মন্তব্যে এগিয়ে বিএনপি, পাল্লা দিচ্ছে জামায়াত-এনসিপিও!

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের প্রথম দিককার সিদ্ধান্তগুলোই জনগণের কাছে ক্ষমতাসীনদের ভাবমূর্তির বার্তা দেয়। ফলে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড যদি সরকার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তার প্রভাব পুরো সরকারের ওপর পড়ে। তাদের মতে, ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ নতুন সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল ঢাকা মেইলকে বলেন, তাকে থামানোর একমাত্র ক্ষমতা হলো তিনি যে ক্যাবিনেটে আছেন, সেই কমিটির শীর্ষ ব্যক্তি অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী। তার নিজেরও কিছু ক্ষমতা আছে। তিনি যদি নিজে উপলব্ধি করেন যে, এসব কাজ করা ঠিক হচ্ছে না, তাহলেই তাকে থামানো সম্ভব। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি যা করেছেন এবং তার কারণে যা কিছু ঘটেছে, তার সবকিছুই সরকারের জন্য বহন করা কঠিন হয়ে যাবে।

সিনিয়র এই সাংবাদিক বলেন, ইউনিয়ন নামকরণ থেকে শুরু করে স্কুলের নামকরণ পর্যন্ত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকি তার কারণে এই সরকারের আমলে প্রথম সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে। চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, একজন গ্রেফতার হয়েছেন। এই ঘটনাগুলো সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলছে।

মাসুদ কামাল আরও বলেন, এসব কর্মকাণ্ডে সরকারের কোনো লাভ হচ্ছে না, বরং ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর—তারা এই পরিস্থিতি কতদিন সহ্য করবে। তবে তার মতে, এসব ঘটনার কারণে সরকারের সুনাম বা গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না।

এএইচ/জেবি