images

জাতীয়

ওসি-এসআইকে কোপানোর আগে ইয়াবা সেবন করছিল হামলাকারীরা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৭ জুন ২০২৬, ০৬:২১ পিএম

  • স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রানা গ্রুপের সদস্য হামলাকারীরা
  • পরিত্যক্ত প্লটটির ১৮ মালিকের একজন নারী এসপি
  • কেয়ারটেকার কাসেম খুলে দেন গেটের তালা
  • আহত বিকাশ ব্যবসায়ীর অবস্থাও গুরুতর

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে সন্দেহভাজন আসামি ধরতে গিয়েছিল আদাবর থানা পুলিশ। তবে তারা ছিলেন সাদা পোশাকে। ফলে এলাকার অনেকেই তাদের পুলিশ হিসেবে চিনতে পারেননি। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, শ্যামলীর একটি বিকাশ দোকানে হামলা ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা ঢাকা উদ্যানের একটি পরিত্যক্ত প্লটের ভেতরে থাকা টিনশেড ঘরে অবস্থান করছে।

তথ্যের ভিত্তিতে চার পুলিশ সদস্য প্লটটির কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার ঘোষ প্রথমে ভেতরে ঢুকতেই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তিন সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীর একজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাতে শুরু করে। তার চিৎকার শুনে আশপাশে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যরা ছুটে আসেন। পরে ওসিসহ অন্যরা এগিয়ে গেলে তাদের ওপরও চাপাতি দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে ওসি ও এসআই আহত হন।

পুলিশ সদস্যদের আহত অবস্থায় দেখে একজন এসআই পিস্তল বের করে গুলি ছোড়েন। এতে পালানোর চেষ্টা করা দুই সন্দেহভাজন আহত হয়। পরে তিনজন সন্দেহভাজন এবং প্লটটির কেয়ারটেকারকে আটক করে পুলিশ।

তবে ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের ওপর হামলার আগে টিনশেড ঘরের ভেতরে কাঠের একটি চৌকিতে বসে ইয়াবা সেবন করছিল ওই তিন যুবক।

মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন এবং এলাকাবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

10

যে প্লটে ঘটেছে ঘটনা

বেড়িবাঁধ থেকে গাবতলীমুখী সড়কে ঢাকা উদ্যান এলাকায় একটি তেল পাম্পের পাশ দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে ডান দিকে বাঁক নেওয়া একটি রাস্তার সামনে ডেলটা গার্মেন্টস। রাস্তার বাঁকের মুখেই প্লটটির অবস্থান।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাসখানেক আগেও সেখানে রিকশা রাখার গ্যারেজ ছিল। সম্প্রতি প্লটটি ১৮ জন ব্যক্তি কিনে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ডিএমপির একজন নারী এসপিও রয়েছেন। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় প্লটটির দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় আবুল কাসেম নামে এক ব্যক্তিকে। তিনিই পরে পুলিশের হাতে আটক হন।

কাসেম প্লটের ভেতরে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে সেখানে একটি চৌকি রেখে রাতে অবস্থান করতেন।

মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্লটটির টিনের গেট বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো। গেট খুলে ভেতরে ঢুকলে টিনশেড ঘরের মধ্যে একটি কাঠের চৌকি উল্টানো অবস্থায় পড়ে আছে। আগে সেখানে রিকশার গ্যারেজ থাকায় জায়গাটি সমান করতে বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগও নেই। প্লটের এক পাশে চালাবিহীন পুরোনো দুটি ইটের ঘর এবং মাঝখানে মাটি ও ইট-পাথরের ঢিবি দেখা যায়।

9

তিন যুবককে ভেতরে ঢুকতে দেখেছেন স্থানীয়রা

প্লটের সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা কয়েকজন জানান, ঈদের ছুটিতে কাসেম গ্রামে গিয়েছিলেন। তিন-চার দিন আগে তিনি এলাকায় ফেরেন।

তাদের ভাষ্য, মঙ্গলবার দুপুরে কাসেম প্লটের টিনের গেট খুলছিলেন। এ সময় তিন যুবক এসে তার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে তাদের ভেতরে রেখে কাসেম ডেলটা গার্মেন্টসের সামনে একটি চায়ের দোকানে যান। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে তাকে খুঁজে বের করে এবং প্লটের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চায়। পরে কাসেমকে নিয়ে পুলিশ গেট খুলতে গেলে হামলার ঘটনা ঘটে।

প্লটটির পশ্চিম পাশে একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় ভাড়া থাকেন ফল ব্যবসায়ী আমীর। তিনি বলেন, তিনজন ভেতরে লুকিয়ে ছিল। পুলিশ কেয়ারটেকারকে গেট খুলতে বলার পর সে গেট খুলেছে। তার আগে সে তাদের ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়েছিল।

‘তারা তখন ভেতরে ইয়াবা খাচ্ছিল’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক যুবক বলেন, ‘তারা তখন ভেতরে ঢুকে বাবা (ইয়াবা) খাচ্ছিল। এর মধ্যে পুলিশ আইসা পড়ে। তারা বের হতে পারে নাই বইলা পুলিশরে কোপাইছিল।’

স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন বলেন, ‘কাসেম তাদের আশ্রয় দিত। এতগুলা পোলা ভেতরে ঢুকলো আর সে কিছুই জানে না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’

পরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাসেম প্রায় ৩৫ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। যে প্লটের কেয়ারটেকার তিনি, তার বিপরীত পাশে একটি রিকশা গ্যারেজ রয়েছে, যার মালিক তার ভাই। তবে ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তার স্ত্রী এলাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন।

11

হামলার আগে কী ঘটেছিল?

এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ওই প্লটের পাশের আরেকটি প্লটে থাকা একটি বাড়ি দখলের উদ্দেশ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক যুবক আসে। তবে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ারা তাদের প্রতিরোধ করে এলাকা থেকে বের করে দেয়। এ সময় একজনকে আটক করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এর কিছুক্ষণ পর আদাবর থানা পুলিশের একটি দল গাবতলী রোডের তেল পাম্পসংলগ্ন এলাকায় এসে অবস্থান নেয়। ওই দলে ওসিও ছিলেন। পরে তারা অভিযানে অংশ নেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পুলিশ সদস্যরা প্লটের ভেতরে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই হামলার শিকার হন। হামলায় এসআই তরুণ কুমার ঘোষ আহত হন। তার চিৎকার শুনে অন্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসেন। ঘটনার পরপরই সাত থেকে আটটি পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলে আসে। পরে তিন সন্দেহভাজন এবং কেয়ারটেকারকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ভুল লোক ধরা হয়েছে কি না, প্রশ্ন স্থানীয়দের

এলাকাবাসীর একটি অংশের দাবি, শ্যামলীর বিকাশ দোকানে হামলার ঘটনায় যে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ হয়েছে, সেখানে দেখা ব্যক্তিদের পোশাকের সঙ্গে ঢাকা উদ্যান থেকে আটক ব্যক্তিদের পোশাকের মিল নেই। এ কারণে তাদের সন্দেহ, পুলিশ হয়তো ভুল ব্যক্তিদের আটক করেছে।

তবে পুলিশের দাবি, আটক তিনজনই শ্যামলীর ছিনতাই চক্রের সদস্য এবং তাদের আটক করতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।

এদিকে শ্যামলীর বিকাশ দোকানে হামলা ও প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় আহত ব্যবসায়ী এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থাও গুরুতর বলে জানা গেছে।

প্লটের পাশের একটি বাসার বাসিন্দা রুবেল জানান, তিনি প্রথমে পুলিশের চিৎকার এবং পরপর দুটি গুলির শব্দ শুনতে পান। এরপর বাইরে এসে দেখেন দুজন পুলিশ সদস্য আহত অবস্থায় রয়েছেন। পরে চারজনকে আটক করে একটি পিকআপে তোলা হয়।

এলাকাবাসী জানান, দুই সন্দেহভাজন ওসি ও এসআইয়ের ওপর হামলা চালায়। ওসির মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করা হলে তিনি হাত দিয়ে ঠেকান। এতে তার বাম হাতে আঘাত লাগে। অন্যদিকে এসআই তরুণ কুমার ঘোষ প্লটের ভেতরে ঢোকার সময় তার হাতের সামনের অংশে চাপাতির কোপ লাগে।

মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি তাদের মধ্যে তিনজন ছিনতাইকারী এবং একজন ওই প্লটের কেয়ারটেকার। কেয়ারটেকার কাসেম তাদের তিন-চার দিন ধরে ওই প্লটে আশ্রয় দিয়েছিল। ফলে তাকেও আটক করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে সেও জড়িত।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মামলায় তিন সন্দেহভাজন ছিনতাইকারী ও কেয়ারটেকার কাসেমকে আসামি করা হবে। এছাড়া আরও কয়েকজনকে আসামি করা হতে পারে। একই সঙ্গে বিকাশ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে।

আহত পুলিশ সদস্যদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এমআইকে/এএস