মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০৯ জুন ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের পুশইনকে কেন্দ্র করে আবারও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ও প্রকাশ্যে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একাধিক চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি ও টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে পাহারায় অংশ নিচ্ছেন। কয়েকটি ঘটনায় পুশইনের জন্য জড়ো করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, পুশইন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিজিবি সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের নাগরিককে অন্য দেশে ফেরত পাঠাতে হলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও যাচাই–বাছাইয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় নাগরিকদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
এসব ঘটনার পর দেশের ২৬ জেলার সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা জোরদার করেছে বিজিবি। সীমান্তে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১ জেলার সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যদেরও যুক্ত করা হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত পাহারায় অংশ নিচ্ছেন।
বিজিবির সঙ্গে রাত জেগে পাহারায় সীমান্তবাসী
দেশের যেসব সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ ও ভারতীয় পুলিশ রাতের আঁধারে ভারতীয় নাগরিকদের পুশইনের চেষ্টা করছে, সেসব এলাকায় কড়া নজরদারি ও পাহারা জোরদার করেছে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণ। অধিকাংশ সীমান্ত এলাকায় মানুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। বিশেষ করে নওগাঁ, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, সাতক্ষীরা, খুলনা, ঝিনাইদহ, মহেশপুর, ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নেত্রকোনা সীমান্তে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকার মানুষ ভারতের পুশইন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তারাও বিজিবির সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
জানা গেছে, শনিবার রাতে কুড়িগ্রামের বকবান্দা ও ঝাউবাড়ী সীমান্তে কয়েকজনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। খবর পেয়ে বিজিবি স্থানীয়দের সহযোগিতায় তা প্রতিহত করে। বিজিবি ও গ্রামবাসীর অবস্থানের কারণে বিএসএফ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এ সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সীমান্ত এলাকায় মাইকিংও করা হয়।
২১টি পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করে বিজিবি
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ২১টি পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। চার দিনে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ২০০-র বেশি ভারতীয়কে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিকবার পুশইনের চেষ্টা করা হয়। এসব ঘটনায় বিজিবি বিএসএফ ও ভারতীয় পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখতে চায়। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফেরত নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
একইভাবে ৬ জুন ঝিনাইদহ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও নেত্রকোনা সীমান্তেও পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তা ব্যর্থ হয়। নেত্রকোনা সীমান্তে জড়ো করে রাখা ১৬-১৭ জন ব্যক্তিকেও পরে অন্যত্র সরিয়ে নেয় বিএসএফ।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ৭ মে পর্যন্ত সময়ে বিএসএফ ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে। এরপর ৭ মে পর্যন্ত আর কোনো ঘটনা না ঘটলেও ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। এরপর আবার শুরু হয় পুশইন ও পুশইনের চেষ্টার ঘটনা।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার, ত্রিপুরার সঙ্গে ৮৫৬ কিলোমিটার, মেঘালয়ের সঙ্গে ৪৪৩ কিলোমিটার, মিজোরামের সঙ্গে ৩১৮ কিলোমিটার এবং আসামের সঙ্গে ২৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তাদের দাবি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বিএসএফ সদস্যরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড বেশি করছে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে বাংলাদেশি দাবি করে পুশইনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো বৈধ নথি দেখাতে পারছে না তারা।
বিজিবি জানিয়েছে, কোনো সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিজিবি-বিএসএফ কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব বৈঠকে বিএসএফ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশি দাবি করলেও তার পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। পরে তাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে।
১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা, ৪৮ ঘণ্টা পর সরিয়ে নেয় বিএসএফ
৬ জুন ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্ত দিয়ে ১১ জন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি জানতে পেরে কড়া পাহারা বসায় বিজিবি। ফলে ওই ১১ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। তারা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা শূন্যরেখায় অবস্থান করেন। তাদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ও কয়েকজন শিশুও ছিল।
বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। পরে গতকাল মধ্যরাতে বাধ্য হয়ে বিএসএফ ওই ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নেয়।
দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান জানান, সোমবার রাত আনুমানিক ৩টার পর বিএসএফ শূন্যরেখায় অবস্থানরত ৩ জন পুরুষ, ৪ জন নারী ও ৪ জন শিশুসহ মোট ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।
নওগাঁ সীমান্তে দুই দফায় ৪৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা
জানা গেছে, দুই দিনে মোট ৪৫ জনকে সাপাহার উপজেলার কলমুডাঙ্গা সীমান্তের ২৩৭/এমপি সীমান্ত পিলার দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে ৮৮ বিএসএফ পান্নাছড়া ক্যাম্পের সদস্যরা।
নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ৩ ও ৫ জুন দুই দফায় ২৮ ও ১৭ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। সীমান্তে টহল আরও বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিজিবি যা বলছে
বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা বলছে
বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ভারতের পুশইনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে এখন পর্যন্ত ভারতকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ভারতের পুশইনের চেষ্টা বিজিবি দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করছে। পাশাপাশি পুশইন বন্ধে ভারত সরকারকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এমআইকে/এআর