মো. মেহেদী হাসান হাসিব
০২ জুন ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম
দেশের কিছু নাগরিক নানা কারণে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) আঙুলের ছাপ দিতে পারেন না। এক্ষেত্রে মোবাইল সিম কার্ড করতে অনেকেই পড়েন বিড়ম্বনায়। পরবর্তীতে ঢাকার নির্বাচন কমিশন ভবনের এনআইডি অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত অনাপত্তি সনদ (এনওসি) নিতে হয় সংশ্লিষ্ট নাগরিককে। এতে ঢাকায় আসা-যাওয়াসহ নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এসব ভোগান্তি কমাতে মাঠ পর্যায়ে ইসির কার্যালয় থেকে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) দেওয়ার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নিবন্ধনের সময় অনেক নাগরিকের আঙুলের ছাপ সঠিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। মোবাইল সিম ক্রয়ের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে তারা সিম কিনতে পারেন না। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) দেওয়া হয়, যেখানে উল্লেখ থাকে যে এনআইডিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। এর ভিত্তিতে তারা পরবর্তীতে মোবাইল সিম ক্রয় করতে পারেন।
কোন শ্রেণির নাগরিকদের আঙুলের ছাপ গ্রহণে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আঙুলের ছাপ গ্রহণের সময় নানা কারণে সমস্যা হয়। তবে যারা অনেক আগে ভোটার হয়েছেন এবং বর্তমানে বয়স ৬০-৭০ বছরের বেশি, তাদের আঙুলের ছাপ অনেক সময় পাওয়া যায় না। আরেকটি শ্রেণি হলো যারা শ্রমিক বা পানির কাজ বেশি করেন, দীর্ঘদিন এ ধরনের কাজের ফলে তাদের আঙুলের ছাপ ক্ষয় হয়ে যায়। ফলে সিম ক্রয়ের সময় তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। নতুন করে আঙুলের ছাপ নেওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবে মেলে না। এজন্য তাদের এনওসি দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, এতদিন এ সংক্রান্ত এনওসি এনআইডি অনুবিভাগ থেকেই দেওয়া হতো। তবে নাগরিকদের ভোগান্তি বিবেচনায় এখন পরিকল্পনা করা হচ্ছে যাতে মাঠ পর্যায় থেকেই এ ধরনের সমস্যা সমাধান বা এনওসি প্রদান করা যায়। ইসি সচিব ইতোমধ্যে আঙুলের ছাপ না থাকা ব্যক্তিদের এনওসি প্রদানের ক্ষমতা মাঠ পর্যায়ে দেওয়ার জন্য এনআইডির মহাপরিচালককে দায়িত্ব দিয়েছেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হলে তা উপস্থাপন করা হবে।
ইসি ভবনের আটতলায় কথা হয় পঞ্চগড় থেকে এনআইডির এনওসি নিতে আসা মজিবরের সঙ্গে। তিনি বলেন, আর্মিরা যে সময় ভোটার করেছিল, সে সময় আমি ভোটার হয়েছিলাম। আমি পেশায় একজন কৃষক। মাঠে-ঘাটে কাজ করি। এখন নতুন একটি সিম কিনতে গিয়ে জানতে পারি আমার আঙুলের ছাপ নিচ্ছে না। এখানে এসেছি একটি প্রমাণপত্র নিতে যে এ এনআইডি আমারই।
আরেক ভোটার হাবিব হোসেন, যিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে তার বৃদ্ধা মায়ের এনআইডির এনওসি নিতে এসেছেন, তিনি বলেন, বয়স্ক মানুষের আঙুলের ছাপের সমস্যা বেশি হয়। তিনি বলেন, সকাল থেকে এখানে আছি। বেশিরভাগই যারা বয়স্ক বা পানি সম্বলিত কাজে যুক্ত, তাদেরই এ সমস্যা হচ্ছে। যদি মাঠ পর্যায় থেকে এ সেবা পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের অনেক সুবিধা হবে। আর ঢাকায় আসতে হবে না, খরচও বাঁচবে এবং সময়ও সাশ্রয় হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সহকারী পরিচালক ও নাগরিকদের এনওসি প্রদানের দায়িত্বে থাকা মুহা. সরওয়ার হোসেন জানান, গত বছর আয়কর রিটার্ন অনলাইনে জমাদানের বিধান চালুর পর থেকে এনওসির চাহিদা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হলো নিজের নামে মোবাইল সিম নিবন্ধিত থাকলে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দেওয়া যায় না। যে কারণে সিম কিনতে গিয়ে আঙুলের ছাপ না মেলায় অনেককেই ফিরে আসতে হয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় মাঠ পর্যায়ে এ সেবা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জানা যায়, এনআইডিতে আঙুলের ছাপের সমস্যা শুরু থেকেই ছিল। ২০১১ সালের ভোটার হালনাগাদের পাইলট প্রকল্পে সর্বপ্রথম এ সমস্যা চিহ্নিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে বিষয়টি সবার নজরে আসে ২০১৬ সালে, যখন বাধ্যতামূলকভাবে এনআইডি ব্যবহার করে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে সিম ক্রয়ের ক্ষেত্রে যাদের আঙুলের ছাপ মেলে না, তাদের এনওসি প্রদান করে আসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির এনওসি সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে মোট এনওসি গ্রহণ করেছে ২ হাজার ৭৮৮ জন। আর চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই এনওসি গ্রহণ করেছেন ২ হাজার ৭০৮ জন।
এমএইচএইচ/এফএ