বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ঢাকা

এনআইডি সংশোধনে নতুন কড়াকড়ি, ভোগান্তিতে প্রবাসীরা

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

এনআইডি সংশোধনে নতুন কড়াকড়ি, ভোগান্তিতে প্রবাসীরা
এনআইডি সংশোধনে বেড়েছে ভোগান্তি। ইনফোগ্রাফি: নোটবুক এলএম

সারাবিশ্বে সেবা যখন বিকেন্দ্রীকরণের দিকে যাচ্ছে, তখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি সেবা কেন্দ্রীয়করণ করা হয়েছে। ফলে এক দিনের বয়স সংশোধন করতেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষকে ঢাকার নির্বাচন ভবনে আসতে হচ্ছে। এতে বেড়েছে ভোগান্তি। অন্যদিকে, শিক্ষাসনদ ছাড়া কোনো এনআইডি সংশোধন করা হবে না—এমন প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ ধরনের সংশোধনের আবেদনসংক্রান্ত নথি স্থগিত রাখা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে যাচ্ছেন প্রবাসীরা।

জানা যায়, সাধারণ নাগরিকদের সংশোধন আবেদনের তুলনায় প্রবাসী ও চাকরিজীবীদের এনআইডি সংশোধন আবেদন নিষ্পত্তিতে ইসি কর্মকর্তাদের বেশি বেগ পেতে হয়। কারণ, বেশিরভাগ প্রবাসী বিদেশি কাগজপত্রের সঙ্গে মিল রেখে বয়স ৬ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কমাতে চান। অন্যদিকে, চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের অনেক নাগরিক বয়স গোপন করে চাকরি নেওয়ার পর সে অনুযায়ী বয়স সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হন।


বিজ্ঞাপন


ইসি সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) ইসির মাসিক সমন্বয় সভায় কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, শিক্ষাসনদ ছাড়া এনআইডির তথ্য সংশোধন না করার। এ বিষয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা যেসব নথি উপস্থাপন করেছিলাম, সেগুলো স্থগিত রেখে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আমরা সেগুলো পুনর্বিবেচনা করে আবার উপস্থাপন করব।

এনআইডিতে প্রবাসীদের বয়স সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে সূত্রটি জানায়, আপাতত যাদের শিক্ষাসনদ আছে, শুধু তাদের আবেদনই অনুমোদন করা হবে। বাকি ক্যাটাগরির আবেদন স্থগিত থাকবে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এসব ফাইল আর উপস্থাপন করা হবে না।

তিনি আরও বলেন, যাদের পাসপোর্ট আছে, তাদের নথি আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হবে। যারা এমপিওভুক্ত চাকরি করেন, তাদের ক্ষেত্রেও আলাদাভাবে নথি উপস্থাপন করা হবে। তবে যারা বিদেশে যাওয়া বা চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বয়স বাড়ানো বা কমানোর জন্য আবেদন করেন, এ ধরনের বয়স সংশোধন আর করা হবে না।

নির্বাচন ভবনের অষ্টম তলায় (লিফট-৭) এনআইডি সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। বয়স সংশোধনের কার্যক্রম মাঠপর্যায় থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের পর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন সেবাগ্রহীতা নির্বাচন ভবনে আসছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেবা নিতে এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।


বিজ্ঞাপন


নির্বাচন কমিশন ভবনের এনআইডি অনুবিভাগে সরেজমিনে গিয়ে দুই সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেইলের এই প্রতিবেদকের। তাদের একজন শফিক আলী, যিনি তার ভাই হোসেন আলীর (ছদ্মনাম) এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিয়ে এসেছেন।

হোসেন আলীর ভাই ঢাকা মেইলকে বলেন, আমি কয়েক মাস ধরে আমার ভাইয়ের এনআইডি সংশোধনের জন্য ঘুরছি। সে ইতালিতে থাকে। এনআইডি সংশোধন না হলে দেশে আসতে পারছে না। আজ এসে আমাকে বলা হলো, যাদের বিদেশি পাসপোর্ট আছে, তাদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ আমার ভাইয়ের শিক্ষাসনদ নেই। আপাতত শুধু যাদের শিক্ষাসনদ আছে, তাদের সংশোধন করা হচ্ছে। এগুলো হয়রানি ছাড়া আর কিছু নয়।

হোসেন আলীর সংশোধন আবেদন ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, তিনি বয়স প্রায় ছয় বছর সংশোধনের আবেদন করেছেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি জন্মসনদ, ভাই-বোনের এনআইডি এবং ইতালির রেসিডেন্স কার্ড জমা দিয়েছেন।

আরেক সেবাগ্রহীতা রাকিব হাসান নিজের এনআইডি সংশোধনের জন্য পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় এসেছেন। তার শিক্ষাসনদ ও এনআইডির বয়সের মধ্যে ১০ দিনের গরমিল রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি সব কাগজপত্র জমা দিয়েছি। তারা আমাকে বলেছে দ্রুত হয়ে যাবে। কতদিন লাগতে পারে জানতে চাইলে বলা হয়েছে, ঈদের আগেও হতে পারে, আবার ঈদের পরেও হতে পারে। আমি এসএমএস পেয়ে যাব।

শিক্ষাসনদ ছাড়া এনআইডির তথ্য সংশোধন না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আপাতত যাদের শিক্ষাসনদ রয়েছে, শুধু তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। বাকিদের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে তখন বলা যাবে। প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সব ক্যাটাগরি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে। গত ৩০ দিনে আমাদের কর্মকর্তারা ৮৯ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করেছেন। একই সময়ে নতুন আবেদন এসেছে প্রায় ৮০ হাজার। সে হিসাবে আবেদন ঝুলে থাকার বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়।

আরও পড়ুন: এনআইডি সংশোধনে স্বচ্ছতা আনতে নতুন পদক্ষেপ ইসির

এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এনআইডি সংশোধনের একটি বড় অংশ ব্যক্তির স্বার্থ। আমাদের ভুলের চেয়ে নাগরিকদের দিক থেকে বেশি ভুল হয়। বেশিরভাগ আবেদনে দেখা যায় এনআইডির তথ্যের আমূল পরিবর্তন চান। এরকম প্রতিটি আবেদনের পেছনে কোনো না কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে। আমি এসব উদ্দেশ্য সামাল দেব কীভাবে। আমার পুরো নাম কেন পরিবর্তন করতে হবে? আমার বয়স কেন পরিবর্তন করতে হবে?

একটি উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ একজন সেবাগ্রহীতা এসেছিলেন, তার নাম খোদেজা; এখন এনআইডিতে এসেছে খাদিজা, এ-কারটি বাদ গেছে—এখানে আমাদের ভুল। কিন্তু নাম খাদিজা, আপনি চাচ্ছেন আইরিন, তাহলে আমি কেন তা পরিবর্তন করে দেব—প্রশ্ন রাখেন ইসি সচিব।

এনআইডি সংশোধনের ভোগান্তি কমাতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, আগামীকাল থেকে আমি নিজে পর্যবেক্ষণ করব। নাগরিকরা কী কারণে চাচ্ছেন, সে কারণ জানতে চাইব। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইসি ভবনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন নাগরিক সেবা নিতে আসছেন—এতে করে ভবনের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা ৫০ জন করে সিডিউল করে তাদের জানিয়ে দেব। এতে নাগরিকদের আসা-যাওয়া কমে যাবে। ভবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

এনআইডি সংশোধনের জন্য সম্প্রতি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সংশোধন করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছে সংস্থাটি। সংশোধিত এসওপি অনুযায়ী সংশোধনের আবেদনের ধরন অনুযায়ী সাতটি ক্যাটাগরি করা হয়। এগুলো হলো—ক, ক-১, খ, খ-১, গ, গ-১ ও ঘ। এক্ষেত্রে আবেদনের জটিলতা অনুযায়ী ক থেকে ঘ পর্যন্ত ক্যাটাগরি নির্ধারিত হয়। আবেদন জমা পড়ার পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করেন।

এর মধ্যে ক-১ ক্যাটাগরি নিষ্পত্তি করেন সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। ক ক্যাটাগরি নিষ্পত্তি করেন উপজেলা কর্মকর্তা। খ-১ ক্যাটাগরি নিষ্পত্তি করেন অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, খ ক্যাটাগরি নিষ্পত্তি করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, গ ক্যাটাগরি নিষ্পত্তি করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। আর যেকোনো ধরনের বয়স সংশোধন ও জটিল আবেদন নিষ্পত্তি হয় ঘ ক্যাটাগরিতে, যা অনুমোদন করেন এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক।

এমএইচএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর