images

জাতীয়

হাটের সীমানা মানছেন না ঢাকার ইজারাদাররা, নির্বিকার সিটি করপোরেশন

আব্দুল হাকিম

২৬ মে ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

  • ব্যারিকেড কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে
  • প্রধান সড়ক ও গলিগুলো হাটে পরিণত
  • রাস্তার মাঝে গরু বাঁধায় তৈরি হচ্ছে বিপদ
  • সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা
  • দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সংকট আরও বাড়বে
  • শুধু জরিমানা নয়, দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে: আদিল মুহাম্মদ খান

রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে নির্ধারিত সীমানা বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে দিয়াবাড়ী মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় প্রধান সড়ক দখল করে হাট বসানো এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে হাটের পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা কার্যত একটি অস্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের গলি পর্যন্ত গরু বাঁধা, ট্রাক পার্কিং এবং অস্থায়ী বাঁশের ঘের দিয়ে দখল হয়ে গেছে। ফলে যানবাহন চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় রাস্তার অর্ধেক অংশ পশুর দখলে থাকায় অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি সেবা এবং সাধারণ যান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে স্বাভাবিক চলাচল এখন প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ হোসেন বলেন, বাসা থেকে বের হলেই মনে হয় কোনো না কোনো গরুর হাটের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ আর অসুস্থদের নিয়ে চলাফেরা সবচেয়ে কঠিন হয়ে গেছে। অনেক সময় রাস্তার মাঝেই গরু বাঁধা থাকায় হেঁটে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বসা পশুর হাট সরালো ডিএমপি

শিল্পাঞ্চল এলাকার ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ করছেন। তাদের দাবি, হাটের কারণে কারখানা ও অফিসে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কর্মীরা সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারছেন না, এমনকি লোড-আনলোড কার্যক্রমেও ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। একজন শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিক বলেন, এটি শুধু ভোগান্তি নয়, আমাদের পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। এই এলাকায় এমনভাবে হাট বসানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

cow_bazar

অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে ইজারাদারদের মাইকিংয়ে ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে পশু না রাখতে। তবে বাস্তবে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেক জায়গায় ইজারাদারদের বসানো ব্যারিকেডও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, কারণ পশু ও ট্রাক দিয়ে পুরো সড়কই দখল হয়ে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গিয়ে দেখা যায়, হাট এলাকায় প্রবেশের একাধিক পথ থাকলেও অধিকাংশ পথেই পশু বাঁধা এবং অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে যানবাহন প্রবেশ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক চালক বাধ্য হয়ে ঘুরপথ ব্যবহার করছেন, এতে অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তি বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটের সীমানা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বরং ধীরে ধীরে তা সড়ক, ফুটপাত এবং শিল্পাঞ্চলের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে শুধু যান চলাচল নয়, নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: গাবতলীমুখী গরুর ট্রাক জোর করে ঢোকানো হচ্ছে মিলেনিয়াম সিটির হাটে!

পিকআপ চালক জামিউল হাসান বলেন, এখানে গাড়ি ঢোকা মানেই ঝুঁকি। হঠাৎ করে গরু সামনে চলে আসে, আবার কোথাও বাঁশ দিয়ে রাস্তা সরু করে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার ভয় সবসময় থাকে।

এর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দিয়াবাড়ী মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গরু বাঁধা নিয়ে। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরা দিয়াবাড়ী এলাকার মেট্রোরেল স্টেশনের আশপাশের সড়ক ও ফুটপাত পর্যন্ত গরু বাঁধার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্টেশন সংলগ্ন মূল চলাচলের পথেও অস্থায়ীভাবে বাঁশের ঘের তৈরি করে পশু রাখা হয়েছে, যা পুরোপুরি নির্ধারিত হাট এলাকার বাইরে পড়ে।

cow_bazar

ফলে মেট্রোরেল স্টেশন এলাকার যাত্রীদের স্বাভাবিক গতিপথ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে গরু, ট্রাক ও হাটের অস্থায়ী কাঠামো বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক জায়গায় ফুটপাত সম্পূর্ণভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীদের সড়কের ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

আব্দুল মজিদ মিঞা নামের একজন যাত্রী বলেন, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন গরু বাঁধা, ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রী হিসেবে স্টেশনে আসা-যাওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে। আগে যেখানে সহজে চলাচল করা যেত, এখন সেখানে ভিড় আর বাধা সবকিছু মিলিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত সীমানার বাইরে হাট বিস্তার শুধু নিয়ম লঙ্ঘনই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামোর কার্যকারিতাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল স্টেশনের মতো সংবেদনশীল ও উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অনেকে।

ব্যবসায়ী মহল আরও কঠোর সমালোচনা করছে। তারা বলছেন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এলাকায় পশুর হাট বসানোই অযৌক্তিক। এখানে শতাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি কাজ করে, অথচ এমন একটি পরিবেশে হাট বসানোয় পুরো এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলো নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ইজারাদারদের কঠোরভাবে নির্দেশনা মানতে বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, হাট ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে এবং কোনো জায়গায় সীমানা লঙ্ঘন বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

cow_bazar

তারা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার অতিরিক্ত চাপের কারণে সাময়িকভাবে সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও সেটি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের টিম কাজ করছে। সিটি করপোরেশন আরও জানায়, হাট এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীর দিয়াবাড়ী পশুর হাটের নির্ধারিত সীমানার বাইরে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে কোরবানির পশু বিক্রি করা হলেও পরে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। তিনি দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের নিয়ে স্টেশনের নিচের সড়ক থেকে সব ধরনের পশু সরিয়ে রাস্তা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন, ইজারাদার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে। সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি বছরই ঈদকে কেন্দ্র করে একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। হাট ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সমন্বয়ের অভাবই মূল কারণ। তারা মনে করেন, স্থায়ী সমাধান না করলে ভবিষ্যতেও এই সংকট থেকে যাবে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এ ধরনের হাট সম্প্রসারণ সরাসরি ইজারা শর্তের লঙ্ঘন। তাদের মতে, নির্ধারিত জায়গার বাইরে হাট বিস্তৃত হলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নগর ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতার প্রতিফলন। যেখানে হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে না থেকে যদি রাস্তা ও শিল্পাঞ্চল দখল করে ফেলে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। এটি বন্ধ করতে হলে সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ভূমিকা দরকার ছিল।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এটি রাষ্ট্রের সুশাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার চিত্র। রাষ্ট্রে কার্যকর সুশাসন থাকলে কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিচে পশুর হাট বসানোর সাহস পেত না। এর অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের বার্তাই দুর্বল এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে কাজ করছে না। মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিচে কেউ হাট বসানোর চিন্তা করবে, এটিই অস্বাভাবিক। সেখানে এমন শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা থাকার কথা, যাতে কেউ এমন পরিকল্পনা করার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।

cow_bazar

তিনি বলেন, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে হাট বসে যাওয়ার পর প্রশাসন গিয়ে বলছে এখানে বসা যাবে না বা জরিমানা করা হবে। এটি কার্যকর শাসনব্যবস্থার চিত্র নয়, বরং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিফলন। প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল হাট বসার আগেই এটি বন্ধ করা। কোথাও অবৈধভাবে দখল বা কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। শুধু জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যারা অবৈধভাবে এই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে জনগণের ভোগান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে, তাদের সরাসরি আইনের আওতায় আনা উচিত।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের মতো স্থাপনা শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেখানে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং পরে গিয়ে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া দেখানো পুরো ব্যবস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে এবং নিয়ম বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কঠোরতা নেই। জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে যারা অবৈধভাবে এই ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে। শুধু অভিযান বা জরিমানার কথা বললে হবে না, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তার ভাষায়, পুরো বিষয়টি এখন এক ধরনের তামাশায় পরিণত হয়েছে।

এএইচ/এআর