images

জাতীয়

মৌসুমি অপরাধীদের টার্গেট কোরবানির হাট, বাড়ছে জাল টাকার ঝুঁকি

একে সালমান

২৫ মে ২০২৬, ০২:১০ পিএম

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। সেসব হাটে লাখ লাখ টাকার লেনদেনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মৌসুমি জাল নোটের অপরাধী চক্র। জাল টাকা তৈরি করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে জেল খেটে জামিনে আসার পর আবারও শুরু করেছেন সেই কারবার। 

আসন্ন কোরবানি ঈদেও জাল টাকার মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা বাড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ক্রেতা-বিক্রেতারা। তারা বলছেন, প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাটগুলোকে টার্গেট করে জাল টাকার নোট বাজারে ছড়িয়ে দেয়। ঈদ সামনে রেখে গরুর হাট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও গণপরিবহণে এই চক্রের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

‎সাধারণ প্রিন্টার, বিশেষ কাগজ, জলছাপ ও গাম ব্যবহার করে এমন সূক্ষ্মভাবে নোট তৈরি করছে চক্রের সদস্যরা, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে জাল নোট শনাক্তকারী সাধারণ মেশিনেও তা ধরা পড়ছে না বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।‎

গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে গড়ে উঠেছে জাল নোট তৈরির কারখানা। সারা বছর উৎপাদন করা নোটগুলো পশুর হাটসহ মার্কেটগুলোতে ছড়িয়ে দিতে মাঠে সক্রিয় থাকে কয়েকটি চক্র। এ চক্রের কথা চিন্তা করে রাজধানীর প্রতিটি পশুর হাটে জাল টাকা প্রতিরোধে তৎপরতা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

এছাড়া পশুর হাটগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও পুলিশের পক্ষ থেকে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন বসানো হয়েছে। কোরবানির পশু কেনাবেচায় জাল নোটের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিটি হাটে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।‎

কয়েকদিনে বিপুল পরিমাণ জাল টাকা উদ্ধার

‎গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) রাজধানীর মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে মো. সজিব হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৪। এসময় তার কাছ থেকে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও জাল টাকা তৈরির মেশিন উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালে জাল নোট তৈরি ও সরবরাহের অভিযোগে র‍্যাব-২ মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল।

‎র‍্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি ঢাকা মেইলকে বলেন, মোহাম্মদপুরের হাউজিং সোসাইটি এলাকায় একটি বাড়িতে জাল টাকা তৈরির কার্যক্রম চলছিল, এমন তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল অভিযান চালায়। এসময় সজিব নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে ১৮ হাজার ৯০০ টাকার জাল নোট, একটি ল্যাপটপ ও জাল টাকা তৈরির মেশিন উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সজিব নিজেকে পেশাদার জাল টাকা প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকার করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি বাসায় জাল নোট তৈরি করে বাজারজাত করছিলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে বরিশালের চৌমাথা এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি জাল নোট প্রিন্টের পিডিএফ কপি সংগ্রহ করতেন। সারাবছর জাল নোট সরবরাহ করলেও আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নগদ টাকার লেনদেন বেশি হওয়ায় এই সময়কে টার্গেট করেছিলেন। এরইমধ্যে তিনি চট্টগ্রাম ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জাল নোট সরবরাহ করেছেন।’

‎এর আগে গত ১৩ মে (বুধবার) রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ কামরুল ইসলাম ও নিষাদ হোসেন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব-৩। এসময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা মূল্যমানের ৪০টি জালনোট (২০ হাজার টাকা) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি সিপিইউ, মনিটর, স্ক্যানার, কালার প্রিন্টার, কি-বোর্ড, মাউস, সংযোগ ক্যাবল এবং এক রিম সাদা কাগজ জব্দ করা হয়।‎

‎এ ঘটনায় র‍্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী ঢাকা মেইলকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মতিঝিল থানার কমলাপুর বাজার রোডের একটি সাইবার নেট ক্যাফেতে অভিযান চালানো হয়। এসময় জালনোট তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।‎

তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা প্রস্তুত করে ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছিল। তারা জালনোটকে আসল টাকা হিসেবে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। মূলত ঈদকে টার্গেট করে এসব জাল নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।‎

‎এছাড়া গত ১৪ মে (বৃহস্পতিবার) উত্তরা পূর্ব থানার সমবায় বাজার (বিডিআর) মার্কেটের সামনে থেকে মো. মজিবুর রহমান নামে একজনকে চার লাখ জাল টাকা ও জাল টাকা বিক্রির নগদ ৪০ হাজার টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন গাজীপুর মহানগর বাসন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুলাল মৃধা ও মামুন নামে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে আরও ৩০ লাখ জাল টাকা, জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, তিনটি কালার প্রিন্টার, এক রোল সোনালি রঙের ফয়েল পেপার, ২০০টি সিকিউরিটি ট্যাগ ও জলছাপ সংবলিত সাদা কাগজ, ১০০টি একপাশে ১০০০ টাকার প্রিন্ট করা কাগজ অপর পাশে সাদা, দুই লিটারের দুটি তরল জাতীয় গাম, একটি কাটার এবং জলছাপ বসানোর দুটি ডাইস উদ্ধার করা হয়।‎

‎এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, গ্রেফতারকৃতরা আন্তঃজেলা জাল টাকা তৈরি চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা তৈরি করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা রয়েছে।‎

‎তিনি আরও বলেন, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা চক্রের কারবারিদের ওপর বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। এছাড়া গরুর হাট কিংবা অন্য কোথায়ও যে কেউ জাল টাকা সরবরাহ করতে না পারে, সেদিক নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে।

‎এদিকে রোববার (২৪ মে) রাজধানীর দিয়াবাড়িতে কোরবানির পশুর হাট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে জাল টাকা ঠেকাতে সরকার সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। 

তিনি বলেন, জাল টাকা শনাক্তে হাটে বিশেষ মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি হাট এলাকায় ব্যাংকিং সেবা রাখা হয়েছে, যেন বিক্রেতারা নিরাপদে অর্থ জমা দিতে পারেন এবং প্রয়োজনে নতুন হিসাব খুলেও অর্থ সংরক্ষণ করতে পারেন।‎

‎একেএস/এএইচ