images

জাতীয়

হাওরাঞ্চলের সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি আসছে: তিতুমীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৯ মে ২০২৬, ১১:০১ এএম

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, শুধু ত্রাণ বা অস্থায়ী উদ্যোগ নয়, হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় সরকার টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।

শুক্রবার (৮ মে) সিলেট সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল, পলি জমে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়া, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংকট আরো গভীর হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। আমরা হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান চাই। সেই লক্ষ্যেই আগামী পাঁচ বছরে কৃষি, পরিবেশ, পানি ব্যবস্থাপনা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অতীতে হাওরাঞ্চলে নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত। ফলে মানুষের প্রত্যাশিত উপকার মেলেনি। বরং নদী ও জলাভূমিতে পলি জমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অনেক স্লুইস গেট অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং জলাবদ্ধতা বেড়েছে। রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমূলক হয়, তাহলে মানুষের পাশে দ্রুত দাঁড়াতে হয়। আমরা সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি।

সাম্প্রতিক অকাল বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন করেছে জানিয়ে তিতুমীর বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তালিকাভুক্ত পরিবারগুলোকে তিন মাস সহায়তা দেওয়া হবে। হাওরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, নদী ও খাল খনন, জলমগ্ন ও ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, হাওর উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন, কৃষিযন্ত্র সরবরাহ এবং সময়মতো শ্রমিক নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

ড. তিতুমীর আরো বলেন, আমরা এমন ধানের জাত চাই, যাতে অকাল বৃষ্টির আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেন। একই সঙ্গে হারভেস্টার, ড্রায়ারসহ আধুনিক কৃষি সরঞ্জামের ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন।

হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বহু দেশীয় মাছ বিলুপ্তির মুখে পড়েছে। মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ায় পরাগায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে বিপুল পরিমাণ পরিযায়ী পাখি এলেও এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি রামসার সাইট। কিন্তু অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে এর বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে।

নতুন হাওর ও জলাশয়-সংক্রান্ত আইনের আওতায় কৃষি, মৎস্য, পানি সম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় জ্ঞানকে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গত ১৭ বছরে হাওরাঞ্চলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ছিল ‘লুটপাট ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক’। ফলে টেকসই সমাধান হয়নি, বরং সংকট আরো বেড়েছে।

তিনি আরো বলেন, কৃষকদের জন্য সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকেরা বীজ, সার, বালাইনাশকসহ বিভিন্ন সেবা পাবেন এবং কৃষি পরিকল্পনাও আরো সহজ হবে।

মতবিনিময় সভায় সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এএইচ/এফএ