images

জাতীয়

লোকসানে মুখ ফেরাচ্ছেন লবণ চাষিরা, মাঝপথে আটকে যাচ্ছে ন্যায্য মূল্য

মহিউদ্দিন রাব্বানি

০১ মে ২০২৬, ০২:৩০ পিএম

উৎপাদন বাড়লেও লাভ নেই, বরং প্রতিকেজিতে লোকসান গুনছেন লবণ চাষিরা। টানা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ চাষ ক্রমেই অলাভজনক হয়ে উঠছে। মাঠ পর্যায়ে কম দামে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি হওয়ায় চাষিরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে লবণ চাষ থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা করছেন।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত লবণ মাঠে ঘুরে দেখা গেছে, চাষিদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। এক কেজি লবণের উৎপাদন খরচ যেখানে প্রায় ৮ টাকা ৭৫ পয়সা, সেখানে চাষিরা বিক্রি করছেন মাত্র ৬ টাকা ২৫ পয়সায়। মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত ঘুরে সেই লবণ মিল মালিকদের কাছে পৌঁছায় প্রায় ৮ টাকা ৫০ পয়সায়। পরে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। এই দীর্ঘ ব্যবধানেই হারিয়ে যাচ্ছে চাষিদের ন্যায্য লাভ।

চাষিদের অভিযোগ, প্রতিকেজিতে অন্তত আড়াই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। এ অবস্থায় খরচের টাকা তুলতে পারলেও সেটাই অনেকের জন্য স্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, ন্যায্য মূল্য পেলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখা সম্ভব হতো, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের তথ্যমতে, দেশে বছরে পরিশোধিত লবণের চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ লাখ টনের বেশি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 

বরং মাঝেমধ্যে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ছে। গত বছর এক লাখ টন লবণ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলেও একই সময়ে বিপুল পরিমাণ দেশীয় লবণ গুদামে পড়ে ছিল।

6

দেশে লবণ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম। কক্সবাজারের মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া, সদর, ঈদগাঁও ও টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়। এই খাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬৫ হাজার চাষি, যাদের জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে এই মৌসুমি আয়ের ওপর।

সরেজমিনে চকরিয়ার বিভিন্ন লবণ মাঠে গিয়ে দেখা যায়, অনেক চাষি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার পুরোপুরি চাষ বন্ধ করার কথাও ভাবছেন। চকরিয়ার কয়েকজন চাষি জানান, তারা গরু বিক্রি করে জমি বর্গা নিয়ে লবণ চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে এখন খরচও উঠছে না। প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে যেখানে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। ফলে প্রতি মণে গড়ে ৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

সরেজমিনে কক্সবাজারের চকরিয়ার ইলিশিয়া (পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়ন) এলাকায় গিয়ে কথা হয় লবণ চাষি হেফাজুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি ঢাকা মেইলকে জানান, প্রতিনিয়ত লবণ চাষের পরিধি সংকুচিত হয়ে আসছে। তার ভাষায়, আমরা অনেক কষ্ট করে চাষ করি, কিন্তু ন্যায্য প্রাপ্য পাই না। বছরে মাত্র চার মাস লবণ চাষ করতে পারি। এরপর বৃষ্টির পানি চলে এলে মাঠ ডুবে যায়।

তিনি আরও বলেন, দিন দিন চাষের খরচ বেড়ে গেছে। জমির মালিককে ভাড়া দিতে হয়, পাশাপাশি পলিথিন, মেশিন ভাড়া, শ্রমিক খরচ এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে লবণের দাম বাড়েনি।

হেফাজুদ্দিনের অভিযোগ, বর্তমানে তারা প্রতি মণ লবণ ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ হিসাব অনুযায়ী এক কেজি লবণের উৎপাদন খরচ প্রায় ৮ টাকা ৭৫ পয়সা। চাষিদের কাছ থেকে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ টাকা ২৫ পয়সায়, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা মিল পর্যায়ে সেই লবণ ৮ টাকা ৫০ পয়সায় কিনছেন। প্রক্রিয়াজাত করার পর উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ টাকায়, আর খুচরা বাজারে সেই লবণ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়।

একই এলাকার চাষি মো. আবদুস সামাদ বলেন, জমি বর্গা, পলিথিন, শ্রমিক মজুরি, জ্বালানি খরচ—সব মিলিয়ে7 

খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাজারে লবণের দাম বাড়েনি। বরং কমেছে। এভাবে চললে টিকে থাকা কঠিন। তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট।

এ বিষয়ে লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রহ পরিষদের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, কিছু মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী মিলে চলতি মৌসুমের শুরুতেই লবণের দাম কমিয়ে দিয়েছেন। এতে চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ওজনেও কারচুপি করা হয়, যেখানে ৪০ কেজিকে এক মণ হিসেবে ধরা হলেও বাস্তবে ৪৫ কেজি হিসেবে হিসাব করা হয়।

অন্যদিকে মিল মালিকদের দাবি, বাজার পরিস্থিতির কারণে লবণের দাম কমেছে। কক্সবাজারের ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আজাদ বলেন, অন্যান্য পণ্যের মতো লবণের বাজারেও প্রভাব পড়েছে। তিনি জানান, তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে প্রতি বস্তা (৮০ কেজি) প্রায় ৬৮০ টাকায় লবণ সংগ্রহ করছেন।

8

প্যাকেটজাত লবণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানান, লবণ পরিশোধনের পর উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ থেকে ২৫ টাকা। এর সঙ্গে প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিপণন খরচ যোগ হয়ে খুচরা বাজারে দাম আরও বেড়ে যায়। এছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের জন্য লাভের একটি নির্দিষ্ট মার্জিন রাখা হয়, যার ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমে না।

বিশ্লেষকদের মতে, লবণ বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তা না হলে একসময় এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি সংকটে পড়ে যেতে পারে।

এমআর/এআরএম