নানা দিবসের জোয়ারে ভাসছে দেশ। তবে, ১মে বিশ্ব শ্রমিক দিবসকে ঘিরে শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। এ দিবসকে ঘিরে আয়োজন, আলোচনা, শোভাযাত্রা আর প্রতিশ্রুতির কমতি নেই। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এ দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ, পেটে ভাত জোটানোর সংগ্রামে যার কোনো বাস্তব প্রভাব নেই।
নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের জীবন মানের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা কিংবা পরিবারের সদস্যদের পড়াশোনায় দায়ভার নেয়নি কোনও সরকার।
শুক্রবার (১ মে) সকালে মোহাম্মদপুর টাউন হলে কথা হয় জুতা মেরামতে কাজ করা (মুচি) কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে।
জুতা মেরামতের শ্রমিক (মুচি) রঞ্জন রায় ঢাকা মেইলকে বলেন, কাগজে-কলমে সরকারের কত দিবস আসে। বিশেষ করে শ্রমিক দিবস। এ দিবস আমাদের মতো শ্রমিকদের জন্য হলেও কখনো কোনো দিন আমাদের দেখার জন্য কেউ আসেনি। আমাদের কোনো খবর নেয়নি কেউ। আমাদের খবর আমাদেরকেই নিতে হয়। কাজ না করলে পেটে খাবার জুটে না।
তিনি আরও বলেন, মে দিবস আমাদের পেটে ভাত দেয় না। আমরা নিজেরাই কষ্ট করতে হয়। যেদিন ভালো কাজ হয় সেদিন পরিবারের সদস্যদের ভালো খাবার দিতে পারি। আর যেদিন কোনো আয় রোজগার হয় না, সেদিন তাদের মুখে ভালো কিছু তুলে দিতে পারিনা।
বিজ্ঞাপন

মুচির কাজ করে প্রতিদিন ৮০০-১০০০ হাজার টাকা আয় করি। এ টাকা দিয়ে পরিবারের খরচ যোগান দিয়ে মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে হয়। এ সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও অন্যান্য খরচ হয়ে যায়। আমাদের কল্যাণে কত শত সংগঠন কাজ করে, অথচ কোনো দিন আমাদের খবর নেয়নি কেউ।
তিনি ঢাকা মেইলকে আরও বলেন, অনেক কাস্টমার এসে বলে, সংগঠন থেকে আপনাদের সহায়তা করে? সরকারের কাছ থেকে আপনাদের নামে তো অনেক অনুদান আসে। কিন্তু কই আমরা তো কোনোদিন সেটি পাইনি।
আজকে (শুক্রবার) সকালে একজন এসে আমাকে একটা গেঞ্জি দিয়ে গেছে। বলছে, আজকে শ্রমিক দিবস এটা গায়ে দেন। এরপর আর কোনো খবর নেই, তারা উধাও।
আরেক মুচি গণেশ রায় বলেন, আমরা দিবস দিয়ে কি করবো। আমাদের নিজেদের রোজগার নিজেরাই করতে হয়। এ রোজগার দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়েই নিজেদের সংসারের খরচ চলে। আমরা অসুস্থ হই, আমাদের পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হয় এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সব এ আয় দিয়েই চলে।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ হলে নিজেরাই জানিনা কি রোগে আমরা আক্রান্ত। কারণ, আমাদের মধ্যে অনেকে অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। আজও আমরা জানতে পারিনি তাদের কি রোগ ছিলো। আমাদের শরীরে কোনো কিছু হলেই আমরা বাসার পাশে ফার্মেসী থেকে কোনো রকম ঔষুধ কিনে খেয়ে কিছুটা সুস্থ হই। টাকার জন্য আমরা হাসপাতালে যেতে পারিনা। হাসপাতালে গেলে পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ ও ডাক্তার দেখিয়ে এরপর ঔষুধপত্র কেনার খরচ দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নাই। আমাদের এমন অবস্থায় সরকার কখনো খবর নেয়নি। সরকার এত এত ভাতা দিচ্ছে অথচ, আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকার এবং আমাদের নিয়ে কাজ করা শ্রমিক সংগঠনগুলো কোনো দিন আমাদের খবর নেয়নি।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সংগঠন মোহাম্মদপুর এ্যালয়েন্স কমিটির সংগঠক পারভেজ হাসান সুমন ঢাকা মেইলকে বলেন, কাগজে-কলমে অনেক নীতি থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। ফলে শ্রমিকরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু বক্তব্য বা শোভাযাত্রা নয় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।
তিনি আরও বলেন, এদিকে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমজীবী মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলাতে না পেরে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে দিবসের আলোচনার চেয়ে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দিনের শেষে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করা।
দিবসগুলো কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে? যতদিন না বাস্তব উন্নতি হচ্ছে, ততদিন তাদের জীবন মানের উন্নতি হবেনা। আমরা চাই সরকার স্ব-উদ্যোগে সকল শ্রেণী পেশার শ্রমিকের ডাটাবেজ তৈরি করে তাদের জীবন মান উন্নয়ন ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পড়াশোনাসহ সু-চিকিৎসার জন্য কাজ করবে।
একেএস/এআরএম




