আব্দুল হাকিম
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
- ৫০৫ উপজেলায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
- ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের দক্ষ করার পরিকল্পনা
- স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ বিষয় নির্ধারণ করা হবে
- অগ্রাধিকার পাবে বিধবা ও প্রতিবন্ধীরা
দেশের বেকার যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে স্বনির্ভর করতে প্রায় ২৭৫ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ‘উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও স্ব-কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ জোরদার (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৫০৫টি উপজেলায় ব্যাপক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যেখানে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী লাখো তরুণ-তরুণীকে স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগকে শুধু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, দারিদ্র্য কমানো এবং শহরমুখী অভিবাসন হ্রাসের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৫০৫টি উপজেলায় মোট ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪০ জন তরুণী-তরুণীকে স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেককে পরবর্তীতে আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বেকার যুবদের একটি বড় অংশকে অন্তত আংশিকভাবে হলেও উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদফতর।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ সরাসরি প্রশিক্ষণের আওতায় আসবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখের কাছাকাছি। তারা বলেন, যুব কর্মসংস্থান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এই প্রকল্পটি সেই নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, প্রশিক্ষণের পর তাদের বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

প্রকল্পে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পাস। এই শর্তের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বেশি অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে (১৪ দিন ও ২১ দিনের স্বল্পমেয়াদি কোর্স)। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছে স্থানীয় অর্থনৈতিক চাহিদা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার ভিত্তিতে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে রান্না ও স্ট্রিট ফুড প্রস্তুত, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি পালন, মাছ চাষ, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন, হস্তশিল্প, পোশাক তৈরি, ব্লক ও বাটিক প্রিন্টিং, পর্যটন গাইডিং, মোবাইল ও যানবাহন মেরামত, কৃষি যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফ্রিল্যান্সিং। বিশেষ করে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের অংশ হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে রাখা হয়েছে, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকল্পে পরিবারভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু একজন নয়, বরং একটি পরিবারের একাধিক সদস্যকে উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।এই ব্যবস্থার আওতায় পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, সবজি উৎপাদন, ফল ও ফুল চাষের মতো কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা হবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহুমুখী আয়ের উৎস তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পে বিধবা নারী, তালাকপ্রাপ্ত নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, চা শ্রমিক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর লোকজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ ব্যাচ নির্ধারণেও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়েছে। সমতল এলাকায় প্রতি ব্যাচে ২৫ জন এবং হাওর, উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকায় প্রতি ব্যাচে ২০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী রাখা হবে।
প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রতিদিন প্রতিটি অংশগ্রহণকারী ১৫০ টাকা ভাতা এবং ৫০ টাকা নাশতার ভাতা পাবেন। এই আর্থিক সহায়তা তাদের প্রশিক্ষণে নিয়মিত অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হলো যুবসমাজকে কেবল চাকরির জন্য অপেক্ষমাণ না রেখে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে।
_20260428_184452685.png)
জানা গেছে, এই প্রকল্পটি পূর্ববর্তী একটি সফল কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ। এর আগে ৫৭টি জেলা ও ৪৪২টি উপজেলায় অনুরূপ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নতুন পর্যায়ে আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পে দেশের ৬৪টি জেলা সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবছর গড়ে সমতল এলাকায় ২৫০ জন এবং হাওর, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে ১৬০ জন করে প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ পাবেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের উপযোগী স্থানে আয়োজন করা হবে এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে বিষয় নির্বাচন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর। একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় দেখা যায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তাদের জন্য কোনো ফলোআপ ব্যবস্থা থাকে না। এই প্রকল্পে যদি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, পরামর্শ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এটি কার্যকর হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের যুব জনসংখ্যা একটি বড় সম্ভাবনা। এই জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে। শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, যুবদের জন্য নেওয়া প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগ সফল করতে হলে সবচেয়ে আগে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, শুধু প্রশিক্ষণ প্রদান করলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না, বরং প্রশিক্ষণের পর বাস্তব জীবনে কতজন তরুণ আত্মকর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, সেটিও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে আধুনিক ও চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে আরও বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করতে হবে, যাতে তরুণরা কেবল চাকরিপ্রার্থী না হয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে বিভিন্ন খাতে অবদান রাখতে পারেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণকে শিল্প ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে এর কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
ড. মুজেরি আরও বলেন, এই ধরনের কর্মসূচির সফলতার জন্য কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা কীভাবে তাদের দক্ষতা কাজে লাগাচ্ছেন, তারা কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছেন কি না কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে টিকে থাকতে পারছেন কি না, এসব বিষয় নিয়মিতভাবে মনিটর করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা সম্ভব হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
এএইচ/এমআর