images

জাতীয়

জ্বালানি সংকটের নামে বাসভাড়া বৃদ্ধিতে দূরপাল্লার যাত্রীদের উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম

জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তে যাত্রীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় দূরপাল্লার বাস যাত্রীরা বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। রোববার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

যাত্রীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ভাড়া বাড়ানো কিছুটা যৌক্তিক হলেও এর প্রভাব পড়ছে তাদের দৈনন্দিন জীবনে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এই বাড়তি ভাড়া বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বেশিরভাগ রুটে পুরনো হিসাবেই ভাড়া দিতে দেখা গেছে যাত্রীদের। তবে যারা দূরপাল্লায় যাতায়াত করেন, তাদের খরচ আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন যাত্রীরা। এটি হলে মাসিক খরচে নতুন করে চাপ তৈরি হবে। 
 
রাজধানীর মিরপুর থেকে মতিঝিল রুটে চলাচলকারী এক বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর আহমেদ বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। তবে একইসঙ্গে মানুষের আয়-সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, পরিকল্পনা ছাড়া বারবার ভাড়া বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়বে। 


 
স্কুলছাত্রী মাসুমা আক্তার বলেন, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য তাকে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে চলতে হয়। কিন্তু এভাবে হঠাৎ করে ভাড়া বেড়ে গেলে সেই হিসাব এলোমেলো হয়ে যাবে। অনেক সময় ভাড়া নিয়ে হেলপারদের সঙ্গে তর্কেও জড়াতে হয়। তবে রোববার কোনো বাসে তাকে বাড়তি ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ নেই এই শিক্ষার্থীর।  
 
তেজগাঁও এলাকায় যাতায়াতকারী যাত্রী আরিফুল ইসলাম বলেন, জ্বালানির খরচ বেড়ে গেলে পরিবহন খাতেও তার প্রভাব পড়বে। তাই কিছুটা ভাড়া বৃদ্ধি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে সেটি যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে।
 
তবে যাত্রীদের গুরুতর অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানো হলেও সেবার মানে কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। অনেক বাসেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, নির্ধারিত স্টপেজে না থামা, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা এবং যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের মতো অনিয়ম আগের মতোই চলছে। ফলে বাড়তি ভাড়া দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার হতাশা তৈরি হয়েছে।
 
সাভার থেকে ঢাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী কর্মজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা দূর থেকে শহরে কাজ করতে আসেন, তাদের জন্য এই ভাড়া বৃদ্ধি আরও কষ্টকর। বাসভাড়া বাড়লেও সংসারের অন্যান্য খরচ কমে না। 

6235463538319232723
রোববার রাজধানীর বেশিরভাগ রুটে চলাচলকারী বাসে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিতে দেখা যায়নি। ছবি: ঢাকা মেইল


 
এদিকে যাত্রীদের কেউ কেউ মনে করছেন, ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের উচিত পরিবহন খাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। নির্ধারিত ভাড়া যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় এবং যাত্রীদের যেন অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য করা না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। একইসঙ্গে বাসের সেবার মান উন্নয়ন এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন যাত্রীরা।
 
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে গত ১৮ এপ্রিল দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বাস ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা আসে।
 
নতুন নির্ধারিত ভাড়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২ টাকা ৪২ পয়সা। একইভাবে ঢাকার পার্শ্ববর্তী ডিটিসিএ এলাকায় প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
 
অন্যদিকে, আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রেও ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ধরনের বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ১১ পয়সা বেশি।
 
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার দিন থেকেই নতুন হার কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়নি। কারণ হিসেবে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট পরিবহন মালিকরা বর্ধিত ভাড়ার আনুষ্ঠানিক চার্ট পাননি।
 
পরবর্তীতে গত শুক্রবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কাছে নতুন ভাড়ার চার্ট সরবরাহ করা হয়। চার্ট পাওয়ার পরই পরিবহনগুলো নতুন ভাড়া কার্যকর করতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তবে যাত্রীদের স্বার্থে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি যেন যৌক্তিক ও নিয়ন্ত্রিত থাকে, সে বিষয়ে নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতা, যার প্রভাব বিভিন্ন খাতে পড়ছে। তবে এর সমাধানে শুধু ভাড়া বৃদ্ধি নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করা, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব। 

এএইচ/ক.ম