জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই দেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতার ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তা ও অর্থনীতির ওপর পড়ছে।’
বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে গণসংহতি আন্দোলন (জিএসএ) আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনবান্ধব জ্বালানি নীতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় তিনি জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণ, ভাড়া কাঠামো, নীতিগত দুর্বলতা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
এম শামসুল আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্য নির্ধারণের কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। কয়লা, ডিজেল, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে কী ধরনের সূত্র বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খাতে পড়লেও ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মোট পরিবহন ভাড়ার একটি সীমিত অংশ জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি পুরো ভাড়ায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলার কথা নয়; কিন্তু প্রস্তাবিত ভাড়া বৃদ্ধি সেই তুলনায় অনেক বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে পরিবহন ভাড়া নির্ধারণে ব্যয়ের খাতভিত্তিক কোনো স্বচ্ছতা নেই। অন্যান্য দেশে পরিবহন ব্যয়ের প্রতিটি উপাদান-যেমন জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রম ও কর-আলাদাভাবে উল্লেখ থাকে। কিন্তু দেশে এ ধরনের কোনো স্বচ্ছ কাঠামো না থাকায় যাত্রীরা প্রকৃত ব্যয় সম্পর্কে অবগত হতে পারেন না এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।’
বিজ্ঞাপন
জেট ফুয়েল ও এলপিজির মূল্য নির্ধারণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোথাও আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে কম বা বেশি ধরে মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, আবার কোথাও প্রভাব ও চাপের কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হচ্ছে- পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে কিছু গোষ্ঠী লাভবান হলেও সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারকে একদিকে লাভবান গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট রাখা এবং অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের চাপ সামাল দেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে, যা নীতিনির্ধারণকে আরও জটিল করে তুলছে। জ্বালানি খাতের বিদ্যমান কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও সেই কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না আসায় একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসছে। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’
এম শামসুল আলম আরও বলেন, ‘জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কার্যকর নীতিগত সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে মূল্য নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।’
এএইচ/এমআই




