জেলা প্রতিনিধি
২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
জ্বালানি তেলের অভাবে ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলের কৃষকেরা। ইরি ও বোরো ধান আবাদ মৌসুমে ডিজেলের অভাবে জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় গ্রীস্মের তীব্র গরমে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে ধানের চারা গাছ। এতে এবার বড় ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছে ফসলের উৎপাদনে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাষিদের কৃষক ও ফুয়েল কার্ড দেওয়া হলেও পাম্পে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে মিলছে না তেল। কৃষকদের দাবি, দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে শিগগির বাজারে দেখা দিতে পারে চালের সংকট।
সরেজমিনে রোববার (২৬ এপ্রিল) বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, খালি বোতল ও গ্যালন নিয়ে কৃষক কার্ড হাতে শ্রীনগর পেট্রোল পাম্পে ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দিয়েছেন আড়িয়াল বিলের কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জমিতে সেচ দিতে মাত্র পাঁচ থেকে দশ লিটার ডিজেলের জন্য পাম্পে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। অন্যদিকে কোনো কোনো পাম্পে তেলের অপেক্ষায় কৃষকদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে এক থেকে দুদিন।
কৃষকদের অভিযোগ, ইরি ও বোর ধানের উৎপাদন মৌসুমে জ্বালানি তেলের এমন তীব্র সংকট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফসলের উৎপাদনে। এরমধ্যে জ্বালানি তেলের নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, জ্বালানি তেল সংকটে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে ফসল উৎপাদনের অন্যতম কৃষি ভান্ডার হিসেবে পরিচিত আড়িয়াল বিলের বিভিন্ন স্থানের সেচ কার্যক্রম। ফলে গ্রীষ্মের তীব্র রোদে পুড়েছে কৃষকের কপাল।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানান, পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় এবার জমিতে আবাদ করা অধিকাংশ ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়া ও দানা ঝরে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে। এতে বড় ক্ষয়ক্ষতি সম্মুখীন হতে হবে কৃষকদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২ হাজার ২০২টি নলকূপ এর মধ্যে ১ হাজার ৮২১টি নলকূপই ডিজেল চালিত। এর মধ্যে ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ ১৮২০টি, ডিজেল চালিত গভীর নলকূপ ১টি। আর বিদ্যুৎ চালিত অগভীর নলকূপ ৩৭৩টি, এছাড়া বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপ রয়েছে মাত্র ৭টি।
এ অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে এবার মুন্সিগঞ্জের ২৪ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া বোরো চাষ চলবে চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত।
শ্রীনগরের আলমপুর এলাকার আড়িয়াল বিলের ধান চাষি বাচ্চু মাঝি বলেন, ডিজেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছি না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারি, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
এই কৃষক বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কৃষক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে, তবু ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল পাই না, আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষাবাদে লাভ তো দূরের কথা, এইবার মূলধনই উঠবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আড়িয়াল বিলের কৃষক নিজাম বেপারী ও স্বপন মাঝিদের মতো জেলার শত শত কৃষকের একই পরিস্থিতি। তেল নেই, সেচযন্ত্র বন্ধ হয়ে পড়ায় আবাদ করা বোরো ধানের জমিতে পানির অভাবে ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তারা সকলই দুশ্চিন্তার মধ্যে দিনযাপন করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ধান চাষিরা জানান, সামান্য কয়েকজন কৃষক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দাম দিয়ে খোলা বাজার থেকে তেল কিনে পাম্প সচল করে জমিতে পানি দিচ্ছেন।

একই দিন আড়িয়ালবিল ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তীব্র জ্বালানি তেলের সংকটে মুন্সিগঞ্জের ৬টি উপজেলায় আবাদ করা বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষককূল। তেলের অভাবে সেচযন্ত্র বন্ধ হয়ে পড়ায় পানির অভাবে বৈশাখ মাসে গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রের তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের চারাগাছ গুলো। এতে মারাত্মক বিপাকে পড়েছে শত শত কৃষক।
বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে আবাদ করা ফসল বাঁচাতে সেচযন্ত্র সচল করার জন্য শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার অসংখ্য কৃষক প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দুপাশে থাকা একাধিক ফিলিং স্টেশনে।
অভিযোগ রয়েছে, পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সরবরাহ সংকটে জ্বালানি তেল (ডিজেল) ভাগ্যে জুটছে না কৃষকদের।
অন্যদিকে একই দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার হরপাড়া এলাকায় ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি তেল ভাগ্যে জোটেনি পাচলদিয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলীর। কৃষক ও ফুয়েল কার্ড থাকা সত্ত্বেও ডিজেল কিনতে না পারায় দুই কানি জমিতে আবাদ করা বোরো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না তিনি। ফলে ‘প্রখর রৌদ্রের তাপে জমির ধান গাছ সব বিনষ্ট হইয়া যাইতাছে’ বলে দুঃখের কথা তুলে ধরেন তিনি।
আড়িয়াল বিলের কৃষক সবুর আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকার নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির পরে বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তেলের জন্য পাম্পে লাইনে ছিলাম। সারাদিন অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। পরে বৃহস্পতিবার সকাল গিয়া দুপুর হইল, তবুও ভাগ্যে জুটলো না তেল। কৃষক শফিকুল ইসলাম, রমিজ উদ্দিন, দিনু বেপারী, জিন্নত মিয়া ও টুকু মোল্লাও একই অভিযোগ করেন।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আরও দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমিগুলো অধিকাংশই সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় সেসব সেচযন্ত্রই বন্ধ রয়েছে। ফলে সঠিক সময়ে জমিতে পানি দিতে না পারায় আবাদ করা ধানের চারাগুলো প্রখর রৌদ্রের তাপে শুকিয়ে যাচ্ছে।
সিরাজদিখান উপজেলার বাসাইল ইউনিয়নের বেজেরহাটি গ্রামের কৃষক সুমন দেওয়ান ঢাকা মেইলকে বলেন, স্থানীয় সিরাজদিখান পেট্রোল পাম্পে গিয়েও ডিজেল কিনতে পারছি না। লিটারপ্রতি ১১৫ টাকার ডিজেল খোলা বাজার থেকে ১৭৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, স্থানীয় আরেকটি নিমতলা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে ডিজেল না পেয়ে ফিরে এসেছি। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে।
এই কৃষক বলেন, আমার মতো জেলার ৬টি উপজেলার বেশির ভাগ বোরো চাষি বিপাকে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আরও বলছেন, কৃষি কাজে দ্রুত ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা ও পাম্পগুলোতে তদারকি না বাড়ালে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে জেলাজুড়ে সরকারের পক্ষ থেকে সহজে তেল পেতে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহের উদ্যোগ থাকলেও প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ, এই সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাজে লাগছে না পেট্রোল পাম্পের তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায়। ফলে তারা আরও বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব দেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। যেহেতু বাংলাদেশ জ্বালানির বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই এই সংকট সরাসরি কৃষিখাতে প্রভাব ফেলছে।
তবে সংকট সমাধানে জেলা প্রশাসক ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালকের দাবি, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, চলমান তেল সংকটের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যেবক্ষণ করছি। বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই সময় পানি সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। আমরা মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছি।
এই কর্মকর্তা বলেন, পাশাপাশি জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে দাবি করে জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী ঢাকা মেইলকে বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহজে তেল পাওয়ার বিষয়টি কৃষকদের জন্য নিশ্চিত করতে। যা যা করণীয় রয়েছে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পগুলোতে যাতে জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো নয়-ছয় করতে না পারে সে বিষয়েও তদারকি চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিনিধি/জেবি