images

জাতীয়

নববর্ষের শোভাযাত্রা রাজনৈতিক ইস্যু হলো কেন?

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। আজকের দিন গিয়ে রাত পেরোলেই কাল শুরু হচ্ছে বাংলা নতুন একটি বছর, বৈশাখ মাসের প্রথম দিন। প্রতি বছর এই দিনটিকে ‘পহেলা বৈশাখ’ হিসেবে দেশব্যাপী মহাসমারোহের সঙ্গে পালন করা হয়। এবারও নববর্ষ উদযাপনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

গত বছর পর্যন্ত পহেলা বৈশাখের দিনে ঢাকায় ‘আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হতো। তবে সরকারি সিদ্ধান্তে এ বছর সিই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। যা বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে রাজনৈতিক বিতর্কও। 

কিন্তু কীভাবে নববর্ষের শোভাযাত্রা রানৈতিক ইস্যু হয়ে গেল? 

ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা বলছেন, একসময় পুরো বৈশাখ উদযাপনকে নিয়েই ‘হিন্দুয়ানী’ কিংবা এ ধরনের আয়োজন ব্যাখ্যা দিয়ে বিতর্ক তৈরির প্রবণতা দেখা যেত। কিন্তু গত এক দশকে এ বিতর্কের কেন্দ্র এসে দাঁড়িয়েছে নববর্ষের শোভযাত্রা।

বিশেষ করে ২০১৬ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা পাওয়ার পর থেকে একে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে, যার ফলে অনেকে মনে করছেন, এটি এখন রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ বলছেন, ‘শত বছর ধরে বৈশাখী মেলাসহ নানা আয়োজনে নববর্ষ উদযাপিত হয়েছে আবহমান এই সমাজে। কারও সমস্যা হয়নি। ফলে শোভাযাত্রা ঘিরে যে বিতর্ক, সেটি যে রাজনৈতিক উদ্দেশে তৈরি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

শোভাযাত্রা ও রাজনীতি

ঢাকায় পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে শোভাযাত্রাটি প্রথম শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। তখন যারা এতে অংশ নিয়েছিলেন তাদের বর্ণনা মতে, এই শোভাযাত্রাটি মূলত সামনে এসেছিল তখনকার এরশাদ সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে ‘অমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বান’ জানিয়েই শোভাযাত্রার নামকরণ করা হয়েছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

তখন থেকেই প্রতিবছর চারুকলা অনুষদ থেকে পহেলা বৈশাখের সকালে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নানা ধরনের ভাস্কর্য, মুখোশ হাতে বর্ণাঢ্য মিছিল বের হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে এতে অংশ নিতে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ।

প্রতি বছর শোভাযাত্রার অন্যতম অনুষঙ্গ থাকে এসব বাঁশ এবং কাগজের তৈরি নানা ভাস্কর্য। যা তৈরি হয় কোনো একটি প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে। এরপর অন্তত এক দশক এই শোভাযাত্রা কিংবা এর নামকরণ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক সামনে আসেনি।

তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের কিছু আয়োজনকে ধর্মভিত্তিক কিছু সংগঠন ও কিছু ধর্মীয় বক্তা ‘হিন্দুয়ানী’ আখ্যায়িত করে ধীরে ধীরে প্রচার শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায়’ পেঁচাসহ নানা ধরনের প্রাণির প্রতিকৃতির ব্যবহারের প্রসঙ্গ সামনে এনে ওই প্রচার চলছিল তখন।

mongol-shovayatra_f

যদিও সেই বিতর্কে সরকার কিংবা মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো তাতে তখনো জড়াতে শুরু করেনি এবং মঙ্গল শোভাযাত্রাও অনেকটা সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখেই আয়োজিত হয়ে আসছিল। এভাবেই তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই শোভাযাত্রাটি বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু ২০১৬ সালে বাংলাদেশে নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা পাওয়ার পর থেকেই এই শোভাযাত্রা রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে শুরু করে। সংস্থাটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ‘অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক কিছু রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা সামাজিক মাধ্যমে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা হিন্দুয়ানী’, ‘এর নাম আনন্দ শোভাযাত্রা ছিল’ – এমন সব প্রচারণা শুরু করে। এভাবে ‘মঙ্গল’ কিংবা ‘আনন্দ’ শোভাযাত্রাকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার সূচনা হয়েছে বলে অনেকে বলে থাকেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর বলেন, ‘এই বিতর্কটাই সাম্প্রতিক ও রাজনৈতিক। এটি শুরু হয়েছে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঘোষণার পর। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন বা প্যারাডাইম শিফটের কারণে নতুন বিতর্ক সামনে আনা হয়েছে।’

যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এসে মঙ্গল শোভাযাত্রায় কিছু মোটিফ ও মুখোশ রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। তখন বিএনপি সমর্থকরা অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রায় এসব মোটিফ ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করেন।

খালেদা জিয়ার মুখাবয়ব সম্বলিত মোটিফের একটি ছবি একটি শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছিল বলে সামাজিক মাধ্যমে তার সমর্থকরা অভিযোগ করেছিলেন। তবে সেই সময়ে চারুকলার আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের কোনো মোটিফ বানানোর বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিএনপি দলগতভাবে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামের বিষয়ে এতদিন কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও এবার ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার আনন্দ শোভাযাত্রা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা দুটিকেই বাদ দিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করার কথা জানিয়েছে।

তবে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে বড় বিতর্কটি হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে। তখনই প্রশ্ন ওঠে, এই আয়োজনটি চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক বিষয়বস্তুতে পরিণত হলো কি না।

তখন সরকার ২০২৫ সালের পহেলা বৈশাখের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম পরিবর্তন করে শোভাযাত্রাটির নাম দেয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। সে সময় শোভাযাত্রার জন্য ‘ফ্যাসিবাদের প্রতিকৃতি’ হিসাবে একটি মোটিফ তৈরি করা হয়, যার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখাবয়বের মিল রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে তখনকার অন্তর্র্বতী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অবশ্য দাবি করেছিলেন, ‘বর্ষবরণের এবারের শোভাযাত্রা রাজনৈতিক নয়’। আর এবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এই শোভাযাত্রার নাম দিয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’, যাকে বিশ্লেষকরা কেউ কেউ রাজনৈতিক মতভেদের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন সরকারের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি করেছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, ‘এই শোভাযাত্রা এককভাবে চারুকলার না। চারুকলা এটি প্রতিবছর আয়োজন করে। এটি সামগ্রিকভাবে একটি বৈশাখী উৎসব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলছেন, বিভিন্ন পন্থার রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এই শোভাযাত্রার নামটাকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেন। বৈশাখ, আনন্দ ও মঙ্গল তো অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। রাজনৈতিক উদ্দেশে কেউ কেউ এটিকে ব্রাকেটবন্দি করতে চাইলে সব মতের মানুষের অংশগ্রহণেই এই অনুষ্ঠান অনন্য। রাজনৈতিক উদ্দেশে কেউ কেউ বিতর্ক করেন। মঙ্গল শোভাযাত্রা সারা দুনিয়ার বাঙ্গালিরা নানা আয়োজন করে। তাদের কাছে বৈশাখ আনন্দ নাকি মঙ্গল সেটা দেখার বিষয় নয়।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ বলছেন, ‘দেশের রাজনীতি যেমন সংকীর্ণ হয়েছে তারই ফল এটা। অনেকে দিনের পর দিন শোভাযাত্রা ও বৈশাখ আয়োজনকে ঘিরে বিরক্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে। এদেশে ইতিহাসের স্বচ্ছতার অভাব প্রকট এবং ইতিহাস জানার চেষ্টাও কম। ইলিশ পান্তা খেলে পাপ হবে- এমন অপপ্রচারও চালানো হয়েছে।’

তবে তার মতে, পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষের বিশালত্বের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব রাজনৈতিক রং লাগানো কিংবা বিতর্কের অবসান হবে।

এএইচ