বাংলা বছরের প্রথম দিনটি সব বাঙালির কাছে এক দারুণ আবেগের নাম। ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এদিন এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। হালখাতা, মেলা, নাগরদোলা আর লোকজ গানের যে ঐতিহ্য শত বছর ধরে চলে আসছে, তা আজও আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নানা অপসংস্কৃতির ভিড়েও পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব পরিচয় আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে টিকে আছে। বাঙালির এই চিরচেনা উৎসব, এর পেছনের ইতিহাস আর টিকে থাকার লড়াই নিয়ে নিজেদের মতামত ও আবেগ তুলে ধরেছেন নানা প্রজন্মের কয়েকজন লেখক।
বিজ্ঞাপন
উৎসবের বিস্তার এবং শুদ্ধচর্চার তাগিদ
পহেলা বৈশাখের বাঙালিয়ানা দ্বিগুণ আনন্দে আমাদের মনকে ভরিয়ে দেয়। মনকে রাঙিয়ে তুলতে এই একটি দিনই আমার কাছে দারুণ উৎসবমুখর মনে হয়। আগে এর পরিধি গ্রামভিত্তিক থাকলেও এখন তা সব জায়গায় প্রসারিত হয়েছে। ঘরে-বাইরে, প্রতিটি সেক্টরে বাহারি সাজ, পোশাক আর খাবারের এই সংস্কৃতি যেন বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি মানায়। এপ্রিল মাস এলেই চারপাশে একটা উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।
আমার মতে, সমাজ ও ব্যক্তিভেদে এর বৈচিত্র্য বেড়েছে, ঐতিহ্য মোটেও হারায়নি। বরং আধুনিকতার ছোঁয়ায় এর প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুনত্ব পাচ্ছে। তবে কিছু মানুষ প্রতিবছরই একে বাধাগ্রস্ত করার পাঁয়তারা করে, যদিও দিন শেষে তারা হেরে যায়। সমাজের অস্থিরতা যদি দূর না হয়, তবে আমাদের প্রজন্ম বাঙালিয়ানার খাঁটি স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাই পহেলা বৈশাখকে তার যোগ্যতায় টিকিয়ে রাখতে হবে। এর সদ্ব্যবহার ও শুদ্ধচর্চার মাধ্যমে সবাইকে উৎসবটি উপভোগ করার সুযোগ করে দিলেই আমাদের প্রাণের উৎসব রক্ষা পাবে।
লেখক: শাম্মী তুলতুল, কথাসাহিত্যিক
বিজ্ঞাপন
অপসংস্কৃতি রুখে দেওয়ার অনুপ্রেরণা
পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালির শেকড়, বাঙালির সংস্কৃতি ও প্রাণের উৎসব। আমাদের এই সংস্কৃতিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছিল, ঠিক যেভাবে তারা মুছতে চেয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারিকে। কিন্তু আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি। একটি শ্রেণি পহেলা বৈশাখকে ভিন্ন সংস্কৃতি বলে প্রচার করে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করে, অথচ এই উৎসব দীর্ঘকাল ধরে পালিত হয়ে আসছে।
আমি মনে করি, এই উৎসব আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিয়মকানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়। বাঙালি ভাণ্ডারে যে সম্পদ রয়েছে, তা অতুলনীয়। আমাদের আছে ভাটিয়ালি, জারি, সারি, বাউল গান; আছে অসংখ্য গল্প, কবিতা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য।
নতুন বছরে আমার চাওয়া, আমরা পরস্পরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করব। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে; আমাদের বড় পরিচয় হবে আমরা মানুষ, আমরা বাঙালি। তরুণদের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা বাঙালি সংস্কৃতিকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিন এবং অপসংস্কৃতি বিতাড়িত করুন।
লেখক: অধম নূর ইসলাম, কবি ও কথাসাহিত্যিক
প্রজন্মের পর প্রজন্মে আবেগের স্থানান্তর
বাংলা বর্ষপঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নানা আনুষ্ঠানিকতায় শুরু হয় বর্ষবরণ। বাঙালির শত বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এই উৎসবকে অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছে। বাঙালির বাঙালিয়ানায় এ উৎসব গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মাটির পুতুল, খেলনা, নাগরদোলা, চরকি, লোকজ সংগীত ও ঐতিহ্যবাহী খেলা বর্ষবরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ করে হালখাতা আর মিষ্টি বিতরণের সংস্কৃতি বর্ষবরণের সঙ্গে এক সুতোয় গাঁথা।
সময়ের পালাক্রমে শত বছর পেরিয়ে গেলেও পহেলা বৈশাখ বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখনো বহুল সমাদৃত। উৎসবের ধরন, রং ও আনন্দের পট পরিবর্তন হলেও নববর্ষ সগৌরবে আমাদের সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে। নাড়ির টান ও নিজস্ব সংস্কৃতির এই উৎসব এখনো বাঙালিকে আবেগময় করে তোলে। পহেলা বৈশাখ ও বাঙালির আবেগ এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়ে এক অসাম্প্রদায়িক উৎসবে রূপ নিচ্ছে।
লেখক: নাইমা খাতুন শিক্ষার্থী, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ
শেকড়ের টান ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসব
পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয় বহন করে। শত বছর ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠী বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করে নিচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উৎসব নয়, বরং প্রতিটি বাঙালির প্রাণের উৎসব, যা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে। বর্তমান সময়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও পালিত হচ্ছে বাঙালির এই উৎসব। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি বাঙালি এই উৎসব পালন করে, যা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।
নতুন বছরে হালখাতার মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীরা বর্ষবরণ করে নেন। দিনটিকে কেন্দ্র করে বসা মেলায় নাগরদোলা ও বায়োস্কোপসহ ঐতিহ্যবাহী নানা অনুষঙ্গ থাকে। নববর্ষকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম ও রঙিন মুখোশ যান্ত্রিক শহরেও পহেলা বৈশাখের স্বকীয়তা ধরে রাখে। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে বৈশাখের দিনে নানা আয়োজনে অংশ নেওয়া আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লেখক: ইবনুল হাসান শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ
এনএম




