নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ট্রাইব্যুনাল দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। কিন্তু এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় শহীদের পরিবার। তারা দাবি করেন, মূল অপরাধীদের সাজা আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কার কী সাজা হলো
রায় ঘোষণার পর আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট নই। মূল অপরাধীদের সাজা আরও বেশি আশা করেছিলাম। পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের দীর্ঘ মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়নি। নামমাত্র স্বল্পমেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু কনস্টেবলের ওপর দিয়ে গেল। যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, তারা বেঁচে গেল। আমরা সকল আসামির ফাঁসি চাই।’
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না-এ প্রশ্নের জবাবে মকবুল হোসেন বলেন, ‘আইনজীবী ও বড় ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘মূল অপরাধীদের আরও দীর্ঘ মেয়াদি সাজা আশা করেছিলাম। সরকারের কাছে দাবি করছি। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই।’
মামলার এক সাক্ষী বলেন, ‘শুধু একজন কনস্টেবলের সাজার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল পার হয়ে গেল। একজন কনস্টেবলকে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গুলির আদেশ দিয়ে থাকে। তাহলে শুধু কনস্টেবলের সাজা দেওয়া হলো কেন? এই রায়ে আমরা অসন্তুষ্ট।’
গত বছরের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি-স্কোয়ার এলাকায় বুলডোজার চাপা দিয়ে আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। আবু সাঈদকে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে দাবি করে আসছে তরুণ সমাজ।
এ ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও কনস্টেবলসহ মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করে তদন্ত সংস্থা। গত কয়েক মাস ধরে ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচারকাজ চলে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের একাংশ রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বললেও আবু সাঈদের পরিবারের অসন্তোষ ইঙ্গিত দিচ্ছে, অনেকের কাছে রায়টি পূর্ণ ন্যায়বিচার হিসেবে ধরা হয়নি। বিশেষ করে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের কম মেয়াদে সাজা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনেই গ্রেফতার আছেন।
যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে তিন পুলিশ সদস্যকে। তারা হলেন-সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
ভিসিসহ ১০ বছরের সাজা হয়েছে যাদের
রায়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল এবং সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফানের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একই সাজা হয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু এবং রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ সভাপতি পমেল বড়ুয়ারও। তাদেরও ১০ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে।
৫ বছরের সাজা হয়েছে যাদের
রিপোর্ট পাল্টে দেওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের রংপুরের সভাপতি ডাক্তার মো. সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দনকে ৫ বছর সাজা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আরপিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু এবং এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমুর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।
৩ বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন- সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।
৩০ আসামির মধ্যে সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। পলাতক আসামির মধ্যে আরও রয়েছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল।
বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় সতর্ক অবস্থান নেয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই গ্রেফতার হওয়া ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের উপস্থিতিতে দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক।
রায় ঘিরে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা ছয় আসামি হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।
বহুল আলোচিত আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ২০২৫ সালের ২৪ জুন। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে ৩০ জুন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন। ওই দিনই অভিযোগটি আমলে নিয়ে ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর শুনানি করেন প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এরপর ৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার শুরু হয় ২৭ আগস্ট। এর পরদিন থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন।
আরও পড়ুন: ইতিহাসের এক কালজয়ী নাম আবু সাঈদ
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা সাক্ষ্যগ্রহণের সমাপ্তি ঘটে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি। এ সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনসহ মোট ২৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালে। তাদের মধ্যে অন্যতম সাক্ষী হাসনাত আবদুল্লাহ। যিনি জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। তার সাক্ষ্য মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো স্পষ্ট করতে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০ জানুয়ারি শুরু হয় যুক্তিতর্ক, যা চলে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। ওই দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরে ৫ মার্চ রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আলোচিত ওই মামলাটির রায় ঘোষণা করা হয়।
আবু সাঈদের পরিবারের দাবি, যারা আদেশ দিয়েছিলেন, তারাও যেন সর্বোচ্চ শাস্তি পান। এই দাবি নিয়ে আগামী দিনে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এমআই