images

জাতীয়

যেসব কারণে সড়কে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০২ এএম

দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশের সড়কব্যবস্থা। এমন কোনো দিন নেই যেদিন সড়কে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এবারের ঈদযাত্রায়ও সড়কে মৃত্যুর মিছিল দেখেছে দেশবাসী। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আতঙ্ক দেখা দিচ্ছে, সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে ঘরে ফেরা যাবে তো! এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। 

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশের একটি বাংলাদেশ। প্রতি বছর এখানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ ঝরে সড়কে। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে বিভিন্ন সময়। বের করা হয়েছে কারণও। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করা হয়েছে নানা সুপারিশও। কিন্তু এসব সুপারিশের নেই কোনো বাস্তবায়ন।    

বিআরটিএ’র তথ্যমতে, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির হিসাব মতে, প্রতি বছর দেশে গড়ে প্রায় ৫ হাজার মানুষ মারা যায় এবং ১০ হাজারের বেশি বিভিন্ন মাত্রায় আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়।

সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার যত কারণ

সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। এর মধ্যে পরিকল্পনাহীনভাবে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানোকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া ভুলপথে গাড়ি চালানো, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে পথচারীদের চলাচল, রাস্তা পারাপারে ওভার ব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করা, রাস্তার ওপর বা ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিকব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলে বিদ্যমান নিয়ম-কানুন প্রতিপালনে যাত্রীদের অনীহাও অনেকাংশে দায়ী। 

accident-dmail_20260327_233155192
এবারের ঈদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ নিহত হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধারাবাহিকভাবে দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। অতিরিক্ত গতি, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং হেলমেট, সিটবেল্ট না বাঁধাকেও দায়ী করছেন কেউ কেই।

দুর্ঘটনার দায় প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু চালক নয়-এখানে বহুমাত্রিক দায় রয়েছে। চালকদের অসচেতনতা ও বেপরোয়া আচরণ বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও পরিবহন মালিকদের মধ্যে অনেকেই ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামাচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকির ঘাটতি এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিবহন খাতের নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাবও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট দুর্ঘটনার বড় অংশেই মোটরসাইকেল জড়িত, যা সড়ক নিরাপত্তার বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল, ট্রাফিক আইন অমান্য, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ক্লান্ত বা অনভিজ্ঞ চালকদের দায়িত্বে গাড়ি চালানো এবং অব্যবস্থাপনা-এসবও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণাতেও দেখা গেছে, সড়কের মোড়, বাঁক ও ব্যস্ত এলাকাগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ, যেখানে যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে।

এবারের ঈদযাত্রায় রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় একটি বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। এতে অন্তত ২৬ জন নিহত হন। এই দুর্ঘটনাটিকে দেশের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার একটি করুণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

doulotdia-bus-accedent
দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় বাসটি পদ্মা নদীতে তলিয়ে ২৬ জন নিহত হয়।

দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সময় নানা সংস্থা সরকারের কাছে একাধিক সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু সেই সুপারিশগুলো সরকারের সংস্থাগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন করে সেটা নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন।

দুর্ঘটনা বাড়ার পেছনে অটোরিকশাকে একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একটা নতুন যান যুক্ত হয়েছে সড়ক-মহাসড়ক ও অলিগলিতে। সেটা হচ্ছে টেসলা বা অটোরিকশা। এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। যান্ত্রিকভাবে এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হলে একমাত্র পথ হলো একটা উন্নত বিকল্প হাজির করা। উন্নত বিকল্প প্রচলন করা গেলে মানুষ এটা ব্যবহার করবে না। মানুষ ব্যবহার না করলে এটা যারা চালায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং চাহিদা কমে যাবে।

এই সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, এটা যেমন নিজেরা আক্রান্ত হয়, দুর্ঘটনা ঘটায়, তেমনি এটার কারণে অন্য যানবাহনও আক্রান্ত হয়। মহাসড়কে এগুলোর চলাচল একেবারেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমাদের মহাসড়কেও অনেক সমস্যা আছে। আমাদের গ্রামীণ সড়কগুলো, আঞ্চলিক সড়কগুলো মহাসড়কেও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার ফলে যারা দ্রুত যাতায়াত করতে চান তারা মহাসড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু নিয়ম হলো এই স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা মহাসড়কে উঠবে না। তারা মহাসড়কের পাশ দিয়ে, গ্রামীণ সড়ক ধরে চলে যাবে। কিন্তু আমাদের সব গ্রামীণ সড়ক তুলে দেওয়া হচ্ছে মহাসড়কে। গ্রামীণ সড়ক থেকে মহাসড়কে উঠে আবার নেমে যাচ্ছে। এই যে উঠে কিছুদূর যাওয়ার পর আবার নেমে যাচ্ছে, তখন তারা বড় বড় দ্রুতগতির যানের সঙ্গে ধাক্কা বা চাপায় পড়ে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে।

এমআইকে/জেবি