আব্দুল হাকিম
০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবহন এখনো সড়কের ওপর নির্ভর, যার ফলে যানজট ও পরিবহন ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। সড়কের এই চাপ কমাতে রেল ও নৌপথ আধুনিকায়নের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এর আওতায় পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ ৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং নাব্য নৌপথ ১০ হাজার কিলোমিটারে পৌঁছে অভ্যন্তরীণ পরিবহন আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশ সড়কের ওপর নির্ভর হওয়ায় যানজট, দুর্ঘটনা এবং অবকাঠামোর ক্ষয় বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ও ব্যয় সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প ও কার্যকর পরিবহন মাধ্যম হিসেবে রেল ও নৌপথকে শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার।
নতুন এমন সমন্বিত রোডম্যাপ দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ কয়েক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে এই রোডম্যাপ প্রণয়ন করছে। ছয় মাসের পরামর্শ ও পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত সুপারিশগুলো শিগগিরই সরকারের উচ্চপর্যায়ে উপস্থাপন করা হবে।
রেল খাতে বড় আধুনিকায়নের প্রস্তুতি
রেল খাতকে এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ৯৩ কিলোমিটার এবং ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মোংলা, চিলাহাটি-ঈশ্বরদীসহ মোট ১০টি প্রধান করিডরে ট্রেন চলাচল করছে।
তবে অবকাঠামোর বড় অংশ পুরনো হওয়ায় রেল পরিচালনায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৯৪টি লোকোমোটিভের মধ্যে প্রায় ৬৯ শতাংশ মিটার গেজ এবং উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রড গেজ লোকোমোটিভ তাদের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। একইভাবে যাত্রীবাহী কোচের অনেকগুলোই পুরোনো। এতে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা ও গতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহের পাশাপাশি রেলপথ আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রধান করিডোরগুলোতে ডুয়াল গেজ ও ডাবল লাইন সম্প্রসারণ, পুরোনো রেললাইন ও সেতুর সংস্কার এবং আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।
রেল খাতকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে বিদ্যুতচালিত ট্রেন চালুর কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করা হবে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা ও ঢাকা-জয়দেবপুর রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
নৌপরিবহন খাতেও শক্তিশালী উদ্যোগ
নৌপরিবহন খাতেও বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীবেষ্টিত বাংলাদেশে নৌপথে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বর্ষাকালে নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কিলোমিটার হলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে ৬ হাজার ১০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। এই নাব্য সংকট মোকাবিলায় ড্রেজিং, নদীশাসন এবং নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নাব্য নৌপথের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। পণ্য পরিবহন বাড়ানো এবং সড়কের চাপ কমানোকে কেন্দ্র করে আশুগঞ্জ, পানগাঁও ও নওয়াপাড়া এলাকায় তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ নৌকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো শিল্পাঞ্চল ও বন্দরগুলোর মধ্যে সংযোগ আরো শক্তিশালী করবে।
পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালকে কেন্দ্র করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ঘিরে পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পাঞ্চল এবং নওয়াপাড়াকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে।
সমুদ্রবন্দর উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বে টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সড়কখাতে সংস্কারেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে
বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের অধীনে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মিলিয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়কের মানোন্নয়ন, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, সার্ভিস লেন সম্প্রসারণ এবং এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, রেল, নৌ ও সড়ককে একীভূত করে একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দেশের লজিস্টিক খরচ কমবে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এএইচ/এমআর