- ২৬ লাখ ৪৭ হাজার পরিবারকে আওতায় আনার প্রস্তাব
- প্রতি পরিবারকে আড়াই হাজার করে দেওয়ার পরিকল্পনা
- প্রথমে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে
- কর্মসূচির আওতায় মোট ৭৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি ইতোমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি দরিদ্র পরিবারের হাতে নগদ সহায়তা পৌঁছে দিতে চায় সরকার। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকেই এই কর্মসূচি দেশব্যাপী বিস্তৃত আকারে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বাজেট প্রক্রিয়ায় এই কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জান গেছে, মানবিক সহায়তা, টিআর ও কাবিখাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান বরাদ্দ ব্যবহার করে সরাসরি দরিদ্র পরিবারের কাছে নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রায় ২৬ লাখ ৪৭ হাজার পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় মোট ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হবে, যা বছরে দাঁড়াবে ৩০ হাজার টাকা। জুলাই মাস থেকেই এই কর্মসূচির বিস্তৃত বাস্তবায়ন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি কেবল একটি নতুন ভাতা কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা প্রকল্পকে একীভূত করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ। এতদিন টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), মানবিক সহায়তা এবং ইজিপিপি (এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওর) নামের পৃথক পৃথক কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হতো। এসব কর্মসূচিতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর সুফল অনেক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে এবং প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠী সমানভাবে উপকৃত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
অর্থ বিভাগের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থাপিত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য, উপকারভোগী নির্বাচন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। ফলে একই পরিবার একাধিক প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পাচ্ছে, আবার অনেক পরিবার কোনো সহায়তাই পাচ্ছে না। এতে ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে এবং স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই বাস্তবতায় সরকার বিদ্যমান বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখেই তার ব্যবহার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ নতুন কোনো অতিরিক্ত বাজেট ছাড়াই পুরনো কর্মসূচির অর্থ একত্র করে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে একদিকে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, অন্যদিকে উপকারভোগীদের কাছে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাতে টিআর, কাবিখা, মানবিক সহায়তা ও ইজিপিপি কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৭ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। পরের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বরাদ্দ আরও বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছায়। ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বাড়লেও এর দৃশ্যমান উন্নয়ন ফলাফল তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে সুপারিশ করা হয়, ছোট ছোট প্রকল্পে বিভক্ত বরাদ্দের পরিবর্তে একটি বড় ও সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসের মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে। এতে উপকারভোগীদের তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে, যা দ্বৈততা কমাতে সহায়ক হবে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য যেন বিভিন্ন প্রকল্প থেকে আলাদা আলাদা সুবিধা না পায়, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হবে।
ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এসব পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল ডেটাবেইস ব্যবহারের ফলে উপকারভোগী নির্বাচন আরও নির্ভুল হবে এবং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কমবে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো এই সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু সতর্কতার কথাও বলেছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, ছোট প্রকল্পভিত্তিক কর্মসূচিতে অনেক সময় প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়ে যান এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একাধিক সুবিধা ভোগ করেন। তার মতে, সরাসরি নগদ সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নগদ সহায়তার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায় আলাদা প্রস্তুতি ও বরাদ্দ বজায় রাখা জরুরি। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে নগদের চেয়েও কার্যকর হতে পারে। এ কারণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ পুরোপুরি বন্ধ না করার পরামর্শ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারি খাদ্য বিতরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নগদ সহায়তা এবং খাদ্য সহায়তার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবেই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করতে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সময়াবদ্ধ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করবে। এ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে একটি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় রূপ দিতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কার্যকর সহযোগিতা হতে পারে।
এএইচ/জেবি

