images

জাতীয়

বাস সংস্কার প্রকল্পে সময় বৃদ্ধির আবদার, আইএমইডির আপত্তি 

আব্দুল হাকিম

১৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৩ এএম

  • ২৪ কোটি ৮৯ লাখের প্রকল্পে খাতভিত্তিক বড় রদবদল 
  • পরামর্শক সেবায় ৭১৭ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব 
  • প্রশিক্ষণ ব্যয় কমছে, বাড়ছে কর্মশালা ও সেমিনার খরচ 
  • পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি বাস সংস্কার পরিকল্পনা 
  • তিন দফা সময় বৃদ্ধি, এখনো শেষ হয়নি পরিকল্পনা

রাজধানীর বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো ও কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর লক্ষ্যে নেওয়া ‘ঢাকা শহরে বাস রুট যৌক্তিকীকরণ ও কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস পরিচালনার জন্য কনসেপ্ট ডিজাইন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা’ প্রকল্পে প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব সম্প্রতি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২৪ কোটি ৮৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের সমান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মূল লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকলেও কিছু কার্যক্রম ও খাতভিত্তিক ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। বিশেষভাবে পরামর্শক সেবায় ৭১৭ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে, প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় কমানো হলেও কর্মশালা ও সেমিনার খরচ বেড়েছে। এছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা প্রকল্পটির কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি এবং বাস রুট পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া দীর্ঘ বিলম্বের কারণে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করছে এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। মূল অনুমোদন ২০২০ সালের ১ মার্চ দেওয়া হয়েছিল এবং শুরুতে প্রকল্পের শেষ হওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছিল ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর প্রথমবার সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়বার ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। চলমান সংশোধনী প্রস্তাবে মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর বিদ্যমান বাস রুটগুলোকে যৌক্তিকীকরণ করে একটি সমন্বিত রুট নেটওয়ার্ক তৈরি, কোম্পানিভিত্তিক অপারেশন চালু এবং বাস পরিচালনায় শৃঙ্খলা ও দক্ষতা বাড়াতে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বাস রুট রেশনালাইজেশন সংক্রান্ত সমীক্ষা, ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, রুট নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন, ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল প্রস্তুত করা, বাস ফ্লিট ও অপারেশনাল স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ, স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায় ব্যবস্থা, বাস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, ডিপো ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রণয়ন। এছাড়া বাস অপারেটর কোম্পানি গঠন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট জনবল প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের অংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীর বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যাত্রী সুবিধা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে কার্যকর সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।

bus_44

সংশোধনী প্রস্তাবে খাতভিত্তিক পরিবর্তনের মধ্যে নতুন খাত অন্তর্ভুক্তি এবং কিছু পুরাতন খাত বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন খাতে পোস্টেজ, পাবলিকেশন, ব্যাংক চার্জ, অন্যান্য ভোগ্যপণ্য, কর্মচারী ব্যতীত অন্যান্যদের সম্মানী এবং অনুষ্ঠান-উৎসব সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, পিআইইউ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, কর প্রযোজ্য খাত, ক্রয় পরামর্শদাতা, দেশীয় পণ্য ও পরিষেবার ওপর ভ্যাট হ্রাস করা হয়েছে। পরামর্শক সেবা খাতে ২০ জনমাস বৃদ্ধি এবং নন-কি ১৮ জনমাস হ্রাসের মাধ্যমে ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ব্যক্তি পরামর্শক ৪৯ জনমাস বৃদ্ধি করা হলেও ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেম উন্নয়নের জন্য কর্মচারী ও এক্সপার্ট নিয়োগ হ্রাস করে ব্যয় কমানো হয়েছে। এসব সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের মোট ব্যয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সংশোধিত প্রস্তাবে ধাপে ধাপে রুট পুনর্বিন্যাস, অপারেটরদের একীভূত কাঠামোয় আনা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিং মডেল, বাস ফ্লিট স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ, স্বয়ংক্রিয় টিকেটিং সিস্টেম, বাস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও ডিপো-টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার কাঠামো প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের তৃতীয়বার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ব্যয় পরিবর্তন ছাড়া কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তারা বলছে, প্রকল্প সংশোধনের যৌক্তিকতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও হ্রাসের কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হবে কি না বিষয়টি সভায় আলোচিত হতে পারে। ঢাকা মহানগরীর পরিবহনসংক্রান্ত সকল দফতর ও স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ে সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধি এবং সংশোধনী কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাস রুট যৌক্তিকীকরণ ও কোম্পানিভিত্তিক সার্ভিসের বাস্তবায়নে বিলম্বের মূল কারণ হিসেবে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় এবং খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে সময় বেশি লেগেছে। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের সময় লকডাউন এবং পরামর্শক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে বিলম্বও প্রকল্পের অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে। প্রথম চুক্তি ১৬ জুলাই ২০২৩-এ সম্পন্ন হলেও প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবে মেয়াদ ও কার্যক্রমের পুনর্বিন্যাসসহ খাতভিত্তিক ব্যয় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনী অনুমোদিত হলে, রাজধানীর বাসব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সমন্বিত কাঠামো প্রতিষ্ঠা, যাত্রী সুবিধা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বর্তমান বাসব্যবস্থা অত্যন্ত খণ্ডিত ও প্রতিযোগিতামূলক। একই রুটে অসংখ্য বাস, ভিন্ন মালিকানা এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা যাত্রীদের জন্য সমস্যার কারণ।

পরামর্শকরা মনে করছেন, সঠিক সমন্বয় ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবে। তবে প্রকল্প পরিচালনায় কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন, আউটসোর্সিং কর্মচারীর নিয়োগ, যানবাহন ভাড়া, অফিস ইক্যুইপমেন্ট এবং বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত ব্যয় কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও খাতভিত্তিক ব্যয় সমন্বয় ছাড়া বাস রুট যৌক্তিকীকরণ ও কোম্পানিভিত্তিক সার্ভিস কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা কঠিন হবে।

এএইচ/জেবি